খেলার ছলে সর্বস্বান্ত শৈশব: গেমিং কারেন্সি থেকে মাইক্রো-বেটিংয়ের অন্ধকার পথ!

  • আপডেটের সময়: ০৬:৪৪:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
  • / 126

বেলাল হোসেন রাজু:

মুঠোফোনের উজ্জ্বল পর্দায় মগ্ন এক কিশোর। বাইর থেকে দেখলে মনে হবে এটি নিছক এক সাধারণ অ্যাকশন গেম। তবে পর্দার আড়ালের চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। মেসেজিং অ্যাপের ভেতরে খোলা হয়েছে একের পর এক গোপন গ্রুপ, যেখানে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে চলছে এন্ট্রি ফির নিয়মিত লেনদেন। প্রতিটি ম্যাচের হারজিতের ওপর বাজি ধরা হচ্ছে নগদ টাকা। খেলার ভেতর কাল্পনিক চরিত্র সাজাতে কিংবা দামি অস্ত্র কিনতেও গেমিং মুদ্রার আড়ালে খরচ করা হচ্ছে ডলার। কোমলমতি শিশুরা যাকে সাধারণ খেলা ভাবছে, তা মূলত অনলাইন জুয়ার এক ভয়ংকর প্রাথমিক পাঠশালা। আর এই পুরো প্রক্রিয়াই ঘটছে পরিবারের চোখের সামনে, ড্রয়িংরুমের ভেতর। ফলে বিনোদনের ছদ্মবেশে তৈরি হওয়া এই চোরাবালি শিশুদের ঠেলে দিচ্ছে মানসিক ট্রমা ও অপরাধের ঝুঁকির মুখে।

খেলার মাঠের জায়গা এখন দখল করে নিয়েছে স্মার্টফোন। অ্যালগরিদমের ফাঁদ আর চটকদার বিজ্ঞাপনের পেছনে লুকিয়ে থাকা এই অদৃশ্য চোরাবালিতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ছে পুরো শৈশব। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, আপাতদৃষ্টিতে এটি বিনোদন মনে হলেও গেমের এই কারিগরি নকশা কিশোরদের মনস্তত্ত্বকে ব্যবহার করে নেশার জালে ফেলে।

আচরণবিজ্ঞানীদের মতে, অনিশ্চিত সময়ে আকস্মিক জয়ের এই ম্যাকানিজম একজন কিশোরের মস্তিষ্কে প্রাপ্তবয়স্ক জুয়াড়ির মতোই তীব্র ডোপামিন ক্ষরণ ঘটায়, যা দ্রুত নিয়ন্ত্রণহীন এক আসক্তিতে রূপ নেয়।

এই মনস্তাত্ত্বিক আসক্তিকে আরও তীব্র করে তুলেছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নকশা। বিজ্ঞান জার্নাল ‘প্লোস ওয়ান’-এ প্রকাশিত গবেষক ড. ডেভিড জেন্ডলের গবেষণায় দেখা গেছে, ভিডিও গেমসের ভেতর ভার্চুয়াল ‘লুট বক্স’ বা ভাগ্যের চাকা ঘোরানোর স্পিন মূলত ক্যাসিনোর ‘স্লট মেশিনের’ হুবহু অনুরূপ। গবেষণার প্রমাণ অনুযায়ী, অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় যেসব শিশু গেমের মুদ্রায় স্পিন ঘোরায়, তাদের ভবিষ্যতে বাস্তব জুয়ায় জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা সাধারণের চেয়ে চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের ‘আইসিডি-১১’-এ ‘গেমিং ডিসঅর্ডার’-কে একটি আনুষ্ঠানিক মানসিক স্বাস্থ্যব্যাধি হিসেবে ঘোষণা করেছে।

তাত্ত্বিক এই গবেষণার চরম সত্যটি ধরা পড়ে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার একটি সাধারণ শিক্ষক পরিবারে। উপজেলার একাদশ শ্রেণির ছাত্র সাগরের (ছদ্মনাম) এই সর্বনাশা জগতে প্রবেশ ঘটেছিল পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময়। মোবাইল গেমে সহপাঠীদের ছোট ছোট চ্যালেঞ্জে জিততে জিততে একপর্যায়ে অনলাইনে ডলার দিয়ে ভার্চুয়াল কয়েন কেনা শুরু করে সে। খেলায় হেরে গেলেই তার মন খারাপ হতো, বাড়ত আক্রমণাত্মক মেজাজ; কারণ গেমের ভেতর দামি অস্ত্র বা পোশাক না থাকলে বন্ধুরা কটাক্ষ করত।

ক্ষোভের বশে সে একাধিকবার নিজের মুঠোফোন আছাড় দিয়ে ভেঙেছে। খেলাধুলার মাঠ হারিয়ে আলোহীন কক্ষে ঘন্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার কারণে সাগরের চোখের দৃষ্টিশক্তি মারাত্মক নষ্ট হয়েছে; চিকিৎসকরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তার চোখ আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরানো প্রায় অসম্ভব।

একই গ্রামের পাশের বাড়ির সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী গেমিং কারেন্সি কেনার টাকা জোগাড় করতে বাবার পকেট থেকে টাকা চুরি করে এবং বাজি ধরে হেরে এলাকায় মারামারিতে জড়িয়েছে। সাগরের ভাষায়, ”শুরুতে এমনিতেই খেলতাম, ভালো লাগত। গেমের ভার্চুয়াল আইডিতে দামি পোশাক বা অস্ত্র না থাকলে বন্ধুদের সাথে পাল্লা দেওয়া যেত না। সহপাঠীরা ব্যঙ্গ করত। সেই লজ্জা আর চাপ থেকেই নিয়মিত কয়েন কেনা শুরু করি।”

ভার্চুয়াল দুনিয়ার এই লড়াই কেবল মফস্বলেই সীমাবদ্ধ নেই; রাজধানী ও বড় বড় জেলা শহরেও তা মহামারি রূপ নিয়েছে। কুমিল্লা শহরের শাকতলা ও টমছমব্রিজ এলাকা এবং রাজধানীর মিরপুর, শ্যামলী ও দক্ষিণ পাইকপাড়ায় সরেজমিনে দেখা যায়, গলির মুখে বা চায়ের দোকানে গোল হয়ে বসে আঙুলে বিশেষ মোজা পরে গেম খেলছে কিশোররা। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অনেকেরই এই ভার্চুয়াল কেনাকাটায় হাতেখড়ি হয়েছে চতুর্থ শ্রেণি থেকে। ফ্রি-ফায়ার ছাড়াও এসআরবিডি টপআপ, এপ্সি, রোবলক্স কিংবা ফ্র্যাগের মতো প্ল্যাটফর্মে ডায়মন্ড, কয়েন ও রোবাক্স কিনতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে নিয়মিত টাকা ঢালছে তারা। এই অনুসন্ধানে কথা হওয়া এক শিক্ষার্থী জানায়, কয়েন কিনতে গিয়ে সে ইতিমধ্যে ৩০ হাজার টাকার ঋণে জড়িয়েছে; আরেক শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত খরচের অঙ্ক ছাড়িয়েছে এক লাখ টাকা। কিশোর মহলে এই বিপুল অর্থ ওড়ানোকে অপরাধ তো দূরের কথা, খুব স্বাভাবিক হিসেবে দেখা হয়; বরং যারা এসব খেলে না, তাদের ‘ব্যাকডেটেড’ বলেও ব্যঙ্গ করা হচ্ছে।

কিশোরদের এই ভার্চুয়াল আর্থিক দ্বন্দ্ব এখন আর কেবল কথার লড়াইয়ে থেমে নেই; তা রক্তক্ষয়ী ও প্রাণহানিতে রূপ নিচ্ছে। দেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই নিষ্ঠুর চিত্রই সামনে এনেছে। মেহেরপুরের গাংনীতে মুঠোফোনে গেমের আইডি ছিনতাই ও ভার্চুয়াল হিসাবের দ্বন্দ্বে দুই কিশোর তাদেরই এক সহপাঠীকে শ্বাসরোধে হত্যা করে। চট্টগ্রামে গেমের হারজিতের জেরে বন্ধুর হাতে খুন হয় আরেক কিশোর। কুষ্টিয়ায় অনলাইন বাজিতে টাকা হারিয়ে দেনার দায়ে বন্ধুকে অপহরণ ও হত্যার মতো চরম ঘটনাও ঘটেছে। এমনকি চট্টগ্রামের আনোয়ারায় গেম খেলার টাকা না পেয়ে মায়ের ওপর কিশোরের হিংস্র হামলার ঘটনা পুরো সমাজকে কাঁপিয়ে দিয়েছে।

শ্রেণিকক্ষের বিপন্ন পাঠ
বাইরের এই সংঘাত ও উন্মাদনার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শ্রেণিকক্ষে। কুমিল্লা চ্যাম্পিয়ন স্কুলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা, শিক্ষক ও লেখক মো. ইয়াছিন শ্রেণিকক্ষের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে জানান, পঞ্চম থেকে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ব্যাপকভাবে অনলাইন গেমে মগ্ন। ক্লাসে তাদের মধ্যে তীব্র অমনোযোগ ও ঝিমুনি দেখা যায়, যার ফল হিসেবে পরীক্ষার ফলাফলে চরম বিপর্যয় ঘটছে। সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো, ক্ষতিকর গেমিং মুদ্রা ও এই বাজিকে শিশুরা কোনো অন্যায় মনে করছে না, বরং বন্ধুদের সামনে এটিকে এক ধরনের আভিজাত্য ভাবছে। শিক্ষাবিদদের মতে, এই অর্থনীতি আগামী প্রজন্মের মেধা ধ্বংস করে দিচ্ছে। কলেজ শিক্ষক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট উম্মে হাবিবা বলেন, খেলার ছলে শুরু হওয়া এই বিনোদন পুরো শৈশবকে এক অলিখিত ঋণ ও জুয়ার চোরাবালিতে আটকে ফেলছে।

খেলার আড়ালে ‘মাইক্রো-ক্যাসিনো’ ও সমবয়সীদের চাপ
শ্রেণিকক্ষের এই অমনোযোগিতার উৎস খুঁজতে গিয়ে দেখা যায় গুগল প্লে-স্টোরে সাধারণ অ্যাকশন গেম হিসেবে থাকা ফ্রি-ফায়ার বা পাবজির মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর অভ্যন্তরীণ রূপান্তর। ফ্রি-ফায়ারের ‘ডায়মন্ড’ কিংবা পাবজির ‘ইউসি’ মূলত কিশোরদের পকেট কাটার ফাঁদ। এর ভেতরের ‘লুট বক্স’ বা ‘লাকি স্পিন’ ক্যাসিনোর আধুনিক সংস্করণ ছাড়া কিছুই নয়, যেখানে ক্ষণিকের মোহে পরিবার অজান্তেই খোয়াচ্ছে হাজার হাজার টাকা। এমনকি পারিবারিক লুডো খেলার অ্যাপেও এখন কয়েন বাজি ধরে ম্যাচ হচ্ছে।

কিশোররা প্রথমে ডিজিটাল কয়েন দিয়ে ‘কাস্টম রুম’ তৈরি করে এবং মেসেঞ্জার বা টেলিগ্রাম গ্রুপে ছড়িয়ে দেয় গোপন কোড। “১০ টাকায় ১০০০ টাকা জেতা যাবে”-এমন চটকদার প্রলোভন দেখিয়ে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে ৫০ থেকে ১০০ টাকা এন্ট্রি ফি নেওয়া হয়। ম্যাচ শেষে সংগৃহীত টাকার বড় অংশ পায় বিজয়ী, আর বাকিটা কমিশন হিসেবে কেটে রাখে আয়োজক কিশোর চক্র। ফলে মুঠোফোনটি রূপ নিচ্ছে পকেট ক্যাসিনোয়, যা সদ্য পাস হওয়া ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’-এর দৃষ্টিতে স্পষ্টত বেআইনি। বাজিতে টাকা হেরে কিশোররা ভয় ও অস্থিরতায় ভোগে, আর সেই খোয়ানো টাকা পরিবারের কাছে লুকানোর মরিয়া চেষ্টা থেকেই তারা পুনরায় ধাবিত হয় নতুন বাজির দিকে। তাছাড়া ভার্চুয়াল আইডিতে দামি পোশাক না থাকলে ‘বট’ বা ‘নুব’ বলে তুচ্ছ করা হয়, যা তাদের আত্মসম্মানে আঘাত হানে, ফলে তারা যেকোনো উপায়ে টাকা জোগাড় করে থাকে।

কিশোর মহাজনি চক্র
অনুসন্ধানে জানা যায়, শুরুতে টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে কিংবা বই কেনার মিথ্যা অজুহাতে পরিবারের কাছ থেকে টাকা নেয় শিশুরা। কাস্টম রুম আর স্পিনে সেই টাকা ফুরিয়ে গেলেই শুরু হয় সংকট। তখন পাড়ার বড় ভাইদের কাছ থেকে চড়া সুদে ধার নিতে শুরু করে কিশোররা। সময়মতো টাকা ফেরত না পেলে আসে হুমকি ও মানসিক চাপ। বাধ্য হয়ে তারা নিজের ব্যবহারের সাইকেল, মুঠোফোন বা হাতঘড়ি বন্ধক রাখে। দেনা শোধ করতে গিয়ে অনেকে চুরি এমনকি কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধেও জড়াচ্ছে। ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থী জানায়, পঞ্চাশ-একশ টাকা দিয়ে শুরু হলেও দেনা একসময় কয়েক হাজারে ঠেকে; বাধ্য হয়ে প্রিয় সাইকেলটি নামমাত্র দামে তুলে দিতে হয় মহাজনের হাতে। শিক্ষকরাও বলছেন, ক্লাসে ঝিমানো আর টিফিনে গেমের বাজি নিয়ে হাতাহাতি এখন কিশোরদের নিত্যদিনের ঘটনা।

অপরাধের আড়ালে গেমিং ফাঁদ: সংশোধন কেন্দ্রের সতর্কবার্তা

পর্দার এই ঋণ আর ভার্চুয়াল উন্মাদনা কীভাবে কিশোরদের আইনের সাথে সংঘাতে জড়াচ্ছে, তার সুস্পষ্ট যোগসূত্র মেলে সংশোধনাগারের নথিতে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের গাজীপুর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের সুপারিনটেনডেন্ট মো. এমরান খান জানান, গেমিংয়ে টাকা খোয়ানোর বিষয়টি হয়তো সরাসরি মামলার এজাহারে লেখা থাকে না, কিন্তু অপরাধের মূলে এটি অন্যতম প্রধান প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। খেলতে খেলতে কিশোররা তীব্র নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সেই নেশার অর্থ জোগাড় ও নৈতিক অবক্ষয়ের শেষ ধাপে তাদের নীতিবোধ বিনষ্ট হয়; যার ফলে তারা ছিনতাই, ডাকাতি, এমনকি হত্যাকাণ্ড বা ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। তিনি উল্লেখ করেন, অপরাধে জড়ানো কিশোরদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যেই অনিয়ন্ত্রিত মুঠোফোন ও অনলাইন গেম ব্যবহারের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। মহামারির সময়ে পড়ালেখার প্রয়োজনে দেওয়া ডিভাইসের লাগামহীন ব্যবহার এই সংকটকে নিয়ন্ত্রণহীন করে তুলেছে।

ইনফ্লুয়েন্সারদের চটকদার প্রচারণা ও প্রমোকোডের ফাঁদে আইন লঙ্ঘন

কিশোরদের এই অপরাধের চোরাবালিতে ঠেলে দেওয়ার পেছনে অন্যতম বড় ভূমিকা রাখছে ফেসবুক ও ইউটিউবের একশ্রেণির গেম স্ট্রিমার ও ইনফ্লুয়েন্সার। লাইভ খেলার সময় তারা কম দামে ডায়মন্ড দেওয়ার প্রলোভন দেখায় এবং বিভিন্ন ‘প্রোমো কোড’ প্রচার করে দাবি করে যে এটি ব্যবহার করলে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত বোনাস মিলবে। অথচ ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’-এর ধারা ১১ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জুয়ার প্রচার চালানো দণ্ডনীয় অপরাধ। আইনের ২২ ধারা অনুযায়ী এর সাজা ৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড। কিন্তু কার্যকর আইনি তদারকির অভাবে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ্যেই চলছে এই প্রলোভনের বিস্তার।

ডোপামিনের বিষাক্ত ফাঁদ: অপরিণত মস্তিষ্কে স্থায়ী ক্ষত
আইনের এই লঙ্ঘনের চেয়েও ভয়ংকর ক্ষত তৈরি হচ্ছে বাড়ন্ত কিশোরদের মনস্তত্ত্ব ও স্নায়ুতন্ত্রে। ভার্চুয়াল মুদ্রা ও বাজির প্রভাব মস্তিষ্কে কীভাবে স্থায়ী রোগ তৈরি করে, তার চিকিৎসাগত ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মুনিম রেজা বলেন, “কিশোর বয়সে মানুষের মস্তিষ্কের ‘প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স’ অংশটি পুরোপুরি গঠিত হয় না, যা আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও ভালো-মন্দের সিদ্ধান্ত নেয়। গেমের ভেতরে যখন স্পিন ঘুরিয়ে আকস্মিক জয়ের প্রলোভন দেখানো হয়, তখন মস্তিষ্কে তীব্র ডোপামিন ক্ষরণ হয়, যা তাকে মারাত্মক আসক্তির দিকে ঠেলে দেয়। আর খেলায় হেরে গেলে শরীরে ‘কর্টিসোল’-এর মতো ক্ষতিকর মানসিক চাপের হরমোন মাত্রাতিরিক্ত নিঃসৃত হয়। তখন সে আক্রমণাত্মক আচরণ করে ।”

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)-এর তথ্যমতে, অতিরিক্ত গেমিং শিশুদের স্বাভাবিক ঘুমের চক্র সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. এস এম আবুল কালাম আজাদের গবেষণায় উঠে এসেছে, ডিজিটাল গেম খেলা কিশোরদের ৩০.৩ শতাংশ তীব্র আসক্তিতে এবং ৫০.৫ শতাংশ মানসিক পীড়নে ভুগছে। আঁচল ফাউন্ডেশনের সমীক্ষা বলছে, গেমের ডায়মন্ড কেনার টাকা না পেয়ে কিংবা পরিবার বাধা দেওয়ায় অনেক কিশোর আত্মহত্যার পথও বেছে নিয়েছে।

গেমিং কারেন্সির কালোবাজার: কিশোর হতাশ, নিঃস্ব পরিবার, লাভবান চক্র
যে ভার্চুয়াল মুদ্রার জন্য শিশুদের এই মানসিক বিপর্যয়, তা কেনার জন্য দেশে গড়ে উঠেছে এক সুসংগঠিত কালোবাজারি চক্র। স্কুলের সামনের ফটোকপি বা মোবাইল রিচার্জের দোকানে কোনো বয়স যাচাই ছাড়াই দেদারসে বিক্রি হচ্ছে ডায়মন্ড ও টপ-আপ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুমিল্লার এক বিক্রেতা জানান, প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থী তাদের কাছে আসে এবং প্রতিদিনের লেনদেন হাজার হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়।

এই ভার্চুয়াল মুদ্রার হাত ধরেই কিশোররা পরে সিকে৪৪, বিজিডি৬৬, কিউ৮৮৮০-এর মতো অনিবন্ধিত অনলাইন গেম এবং ওয়ানএক্সবেট, মেলবেট, বেট৩৬৫-এর মতো আন্তর্জাতিক বেটিং প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হচ্ছে। সাইটগুলো বন্ধ থাকলে ভিপিএন বা বিকল্প এপিকে ফাইল ব্যবহার করে বাজি ধরা হচ্ছে, যার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা হুন্ডির পথে পাচার হয়ে যাচ্ছে দেশের বাইরে।

কিশোরদের এই অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেন প্রসঙ্গে দেশের কয়েকটি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করা হলেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা ও নীতিনির্ধারকদের দায়
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, দেশজুড়ে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের বিস্তার ঘটলেও শিশুদের সুরক্ষায় কোনো কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক বলয় গড়ে ওঠেনি। বিটিআরসি ও সিআইডি পাঁচ সহস্রাধিক অনলাইন জুয়ার সাইট বন্ধ করেছে এবং বিএফআইইউ জব্দ করেছে হাজার হাজার এমএফএস অ্যাকাউন্ট। তবে এসব পদক্ষেপের পুরোটাই প্রাপ্তবয়স্কদের সরাসরি ক্যাসিনো সাইটকেন্দ্রিক। অনলাইন গেমের আড়ালে শিশুদের ভার্চুয়াল মুদ্রা কেনাবেচা ও বাজি ধরার বিষয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্যভাণ্ডার বা প্রতিরোধ সেল নেই। এমনকি এমএফএসের মাধ্যমে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ইন-গেম পারচেজ বা ভাউচার কেনা ঠেকানোর মতো কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনাও দেয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা বিটিআরসি। শিশু একাডেমি বা সমাজসেবা অধিদপ্তরের মতো সংস্থাগুলোর কাছেও এই ক্ষতিকর ভার্চুয়াল অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি উপেক্ষিত।

কড়া আইন, তবু ফাঁকফোকর: সুরক্ষাহীন শৈশব
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও কুমিল্লা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ বদিউল আলম সুজন বলেন, “সদ্য পাস হওয়া ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ এবং ‘শিশু আইন, ২০১৩’-এর মধ্যে বড় ধরনের সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। নতুন আইনে অনলাইন জুয়া নিষিদ্ধ হলেও ভিডিও গেমসের অভ্যন্তরীণ ‘লুট বক্স’ বা ভার্চুয়াল কয়েন কেনাবেচাকে সরাসরি জুয়ার আওতায় আনা হয়নি। ফলে এই বড় আইনি ফাঁকফোকর রয়েই গেছে। এছাড়া জুয়া আইনে আয়োজকদের শাস্তির বিধান থাকলেও যেসব শিশু ভুক্তভোগী হয়ে ঋণের দায়ে অপরাধে জড়াচ্ছে, তাদের আদালতে না নিয়ে বাধ্যতামূলক মানসিক কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের আইনি ফ্রেমওয়ার্ক থাকা দরকার।” তিনি হাইকোর্টের আদেশের মাধ্যমে গেমের এসব জুয়া সুলভ অ্যালগরিদম বন্ধের এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের লেনদেন ঠেকাতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দায় স্পষ্ট করার দাবি জানান।

অন্যদিকে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির পরিচালক (অপারেশন) মো. হোসেন বিন আমিন জানান, “নাগরিকদের বিভিন্ন সাইবার অভিযোগ গ্রহণের জন্য এজেন্সির নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম কার্যকর রয়েছে। কোনো ক্ষতিকর বা জুয়ার ওয়েবসাইট বন্ধের অনুরোধ বা সুপারিশ এলে তা যাচাই করে আমরা বন্ধের ব্যবস্থা নেই। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—আমরা ১০টি বা ২০টি সাইট বন্ধ করলে চক্রগুলো প্রতিনিয়ত নতুন ডোমেইন বা পদ্ধতি তৈরি করে ফেলে। ফলে একটা বন্ধ করলে আরেকটা খোলে। একারণে শুধু ব্লকিং দিয়ে হবে না; বিটিআরসি, আইএসপি এবং আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সমন্বিত রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।”

সংকটজয়ের বৈশ্বিক ও দেশীয় সমাধান
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডস ইতিমধ্যে ভিডিও গেমসের ভেতর অর্থের বিনিময়ে ‘লুট বক্স’ কেনাকে পুরোপুরি জুয়া হিসেবে ঘোষণা দিয়ে নিষিদ্ধ করেছে। অস্ট্রেলিয়াতেও অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এ ধরণের গেমসে বয়সসীমা কঠোরভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা একমত যে কেবল কঠোরভাবে ফোন কেড়ে নিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির পরিচালক মো. হোসেন বিন আমিন জানান, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারে প্রশিক্ষণ দিতে ৬৪ জেলায় সরকারের একটি সচেতনতামূলক প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। তবে তাঁর মতে, পরিবারের ভেতরে রাষ্ট্রের নজরদারি সম্ভব নয়; তাই অভিভাবকদের প্যারেন্টাল কন্ট্রোল টুলস ব্যবহার করে সন্তানের অনলাইন গতিবিধির ওপর সজাগ থাকতে হবে। গাজীপুর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের সুপারিনটেনডেন্ট মো. এমরান খান মনে করেন, শিশুদের জন্য ইন্টারনেটে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে কঠোর সুরক্ষা নীতি থাকা অপরিহার্য।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশেও ভিডিও গেমসে টাকার বিনিময়ে যেকোনো ধরনের স্পিন, লুট বক্স কিংবা ভার্চুয়াল মুদ্রা কেনার সুবিধা অবিলম্বে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা জরুরি। একই সাথে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গেমিং কারেন্সি কেনাবেচায় জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি অভিভাবকদের দ্বি-স্তরীয় বায়োমেট্রিক ওটিপি অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা সময়ের দাবি। নিছক প্রযুক্তিগত নজরদারি বা সাময়িক সাইট বন্ধ করে এই চোরাবালি থেকে পরবর্তী প্রজন্মকে বাঁচানো সম্ভব নয়। পাড়া-মহল্লায় হারিয়ে যাওয়া খেলার মাঠ পুনরুদ্ধার, উন্মুক্ত ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পুনরুজ্জীবন ঘটিয়ে মুঠোফোনের বন্দিদশা থেকে শিশুদের মুক্ত করাই এখন রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ভার্চুয়াল পর্দার কৃত্রিম ডোপামিন নয়, মুক্ত বাতাসের স্বাভাবিক আনন্দই কেবল পারে অবরুদ্ধ এই শৈশবকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে।

ট্যাগ :

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন


খেলার ছলে সর্বস্বান্ত শৈশব: গেমিং কারেন্সি থেকে মাইক্রো-বেটিংয়ের অন্ধকার পথ!

আপডেটের সময়: ০৬:৪৪:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

বেলাল হোসেন রাজু:

মুঠোফোনের উজ্জ্বল পর্দায় মগ্ন এক কিশোর। বাইর থেকে দেখলে মনে হবে এটি নিছক এক সাধারণ অ্যাকশন গেম। তবে পর্দার আড়ালের চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। মেসেজিং অ্যাপের ভেতরে খোলা হয়েছে একের পর এক গোপন গ্রুপ, যেখানে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে চলছে এন্ট্রি ফির নিয়মিত লেনদেন। প্রতিটি ম্যাচের হারজিতের ওপর বাজি ধরা হচ্ছে নগদ টাকা। খেলার ভেতর কাল্পনিক চরিত্র সাজাতে কিংবা দামি অস্ত্র কিনতেও গেমিং মুদ্রার আড়ালে খরচ করা হচ্ছে ডলার। কোমলমতি শিশুরা যাকে সাধারণ খেলা ভাবছে, তা মূলত অনলাইন জুয়ার এক ভয়ংকর প্রাথমিক পাঠশালা। আর এই পুরো প্রক্রিয়াই ঘটছে পরিবারের চোখের সামনে, ড্রয়িংরুমের ভেতর। ফলে বিনোদনের ছদ্মবেশে তৈরি হওয়া এই চোরাবালি শিশুদের ঠেলে দিচ্ছে মানসিক ট্রমা ও অপরাধের ঝুঁকির মুখে।

খেলার মাঠের জায়গা এখন দখল করে নিয়েছে স্মার্টফোন। অ্যালগরিদমের ফাঁদ আর চটকদার বিজ্ঞাপনের পেছনে লুকিয়ে থাকা এই অদৃশ্য চোরাবালিতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ছে পুরো শৈশব। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, আপাতদৃষ্টিতে এটি বিনোদন মনে হলেও গেমের এই কারিগরি নকশা কিশোরদের মনস্তত্ত্বকে ব্যবহার করে নেশার জালে ফেলে।

আচরণবিজ্ঞানীদের মতে, অনিশ্চিত সময়ে আকস্মিক জয়ের এই ম্যাকানিজম একজন কিশোরের মস্তিষ্কে প্রাপ্তবয়স্ক জুয়াড়ির মতোই তীব্র ডোপামিন ক্ষরণ ঘটায়, যা দ্রুত নিয়ন্ত্রণহীন এক আসক্তিতে রূপ নেয়।

এই মনস্তাত্ত্বিক আসক্তিকে আরও তীব্র করে তুলেছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নকশা। বিজ্ঞান জার্নাল ‘প্লোস ওয়ান’-এ প্রকাশিত গবেষক ড. ডেভিড জেন্ডলের গবেষণায় দেখা গেছে, ভিডিও গেমসের ভেতর ভার্চুয়াল ‘লুট বক্স’ বা ভাগ্যের চাকা ঘোরানোর স্পিন মূলত ক্যাসিনোর ‘স্লট মেশিনের’ হুবহু অনুরূপ। গবেষণার প্রমাণ অনুযায়ী, অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় যেসব শিশু গেমের মুদ্রায় স্পিন ঘোরায়, তাদের ভবিষ্যতে বাস্তব জুয়ায় জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা সাধারণের চেয়ে চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের ‘আইসিডি-১১’-এ ‘গেমিং ডিসঅর্ডার’-কে একটি আনুষ্ঠানিক মানসিক স্বাস্থ্যব্যাধি হিসেবে ঘোষণা করেছে।

তাত্ত্বিক এই গবেষণার চরম সত্যটি ধরা পড়ে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার একটি সাধারণ শিক্ষক পরিবারে। উপজেলার একাদশ শ্রেণির ছাত্র সাগরের (ছদ্মনাম) এই সর্বনাশা জগতে প্রবেশ ঘটেছিল পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময়। মোবাইল গেমে সহপাঠীদের ছোট ছোট চ্যালেঞ্জে জিততে জিততে একপর্যায়ে অনলাইনে ডলার দিয়ে ভার্চুয়াল কয়েন কেনা শুরু করে সে। খেলায় হেরে গেলেই তার মন খারাপ হতো, বাড়ত আক্রমণাত্মক মেজাজ; কারণ গেমের ভেতর দামি অস্ত্র বা পোশাক না থাকলে বন্ধুরা কটাক্ষ করত।

ক্ষোভের বশে সে একাধিকবার নিজের মুঠোফোন আছাড় দিয়ে ভেঙেছে। খেলাধুলার মাঠ হারিয়ে আলোহীন কক্ষে ঘন্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার কারণে সাগরের চোখের দৃষ্টিশক্তি মারাত্মক নষ্ট হয়েছে; চিকিৎসকরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তার চোখ আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরানো প্রায় অসম্ভব।

একই গ্রামের পাশের বাড়ির সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী গেমিং কারেন্সি কেনার টাকা জোগাড় করতে বাবার পকেট থেকে টাকা চুরি করে এবং বাজি ধরে হেরে এলাকায় মারামারিতে জড়িয়েছে। সাগরের ভাষায়, ”শুরুতে এমনিতেই খেলতাম, ভালো লাগত। গেমের ভার্চুয়াল আইডিতে দামি পোশাক বা অস্ত্র না থাকলে বন্ধুদের সাথে পাল্লা দেওয়া যেত না। সহপাঠীরা ব্যঙ্গ করত। সেই লজ্জা আর চাপ থেকেই নিয়মিত কয়েন কেনা শুরু করি।”

ভার্চুয়াল দুনিয়ার এই লড়াই কেবল মফস্বলেই সীমাবদ্ধ নেই; রাজধানী ও বড় বড় জেলা শহরেও তা মহামারি রূপ নিয়েছে। কুমিল্লা শহরের শাকতলা ও টমছমব্রিজ এলাকা এবং রাজধানীর মিরপুর, শ্যামলী ও দক্ষিণ পাইকপাড়ায় সরেজমিনে দেখা যায়, গলির মুখে বা চায়ের দোকানে গোল হয়ে বসে আঙুলে বিশেষ মোজা পরে গেম খেলছে কিশোররা। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অনেকেরই এই ভার্চুয়াল কেনাকাটায় হাতেখড়ি হয়েছে চতুর্থ শ্রেণি থেকে। ফ্রি-ফায়ার ছাড়াও এসআরবিডি টপআপ, এপ্সি, রোবলক্স কিংবা ফ্র্যাগের মতো প্ল্যাটফর্মে ডায়মন্ড, কয়েন ও রোবাক্স কিনতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে নিয়মিত টাকা ঢালছে তারা। এই অনুসন্ধানে কথা হওয়া এক শিক্ষার্থী জানায়, কয়েন কিনতে গিয়ে সে ইতিমধ্যে ৩০ হাজার টাকার ঋণে জড়িয়েছে; আরেক শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত খরচের অঙ্ক ছাড়িয়েছে এক লাখ টাকা। কিশোর মহলে এই বিপুল অর্থ ওড়ানোকে অপরাধ তো দূরের কথা, খুব স্বাভাবিক হিসেবে দেখা হয়; বরং যারা এসব খেলে না, তাদের ‘ব্যাকডেটেড’ বলেও ব্যঙ্গ করা হচ্ছে।

কিশোরদের এই ভার্চুয়াল আর্থিক দ্বন্দ্ব এখন আর কেবল কথার লড়াইয়ে থেমে নেই; তা রক্তক্ষয়ী ও প্রাণহানিতে রূপ নিচ্ছে। দেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই নিষ্ঠুর চিত্রই সামনে এনেছে। মেহেরপুরের গাংনীতে মুঠোফোনে গেমের আইডি ছিনতাই ও ভার্চুয়াল হিসাবের দ্বন্দ্বে দুই কিশোর তাদেরই এক সহপাঠীকে শ্বাসরোধে হত্যা করে। চট্টগ্রামে গেমের হারজিতের জেরে বন্ধুর হাতে খুন হয় আরেক কিশোর। কুষ্টিয়ায় অনলাইন বাজিতে টাকা হারিয়ে দেনার দায়ে বন্ধুকে অপহরণ ও হত্যার মতো চরম ঘটনাও ঘটেছে। এমনকি চট্টগ্রামের আনোয়ারায় গেম খেলার টাকা না পেয়ে মায়ের ওপর কিশোরের হিংস্র হামলার ঘটনা পুরো সমাজকে কাঁপিয়ে দিয়েছে।

শ্রেণিকক্ষের বিপন্ন পাঠ
বাইরের এই সংঘাত ও উন্মাদনার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শ্রেণিকক্ষে। কুমিল্লা চ্যাম্পিয়ন স্কুলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা, শিক্ষক ও লেখক মো. ইয়াছিন শ্রেণিকক্ষের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে জানান, পঞ্চম থেকে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ব্যাপকভাবে অনলাইন গেমে মগ্ন। ক্লাসে তাদের মধ্যে তীব্র অমনোযোগ ও ঝিমুনি দেখা যায়, যার ফল হিসেবে পরীক্ষার ফলাফলে চরম বিপর্যয় ঘটছে। সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো, ক্ষতিকর গেমিং মুদ্রা ও এই বাজিকে শিশুরা কোনো অন্যায় মনে করছে না, বরং বন্ধুদের সামনে এটিকে এক ধরনের আভিজাত্য ভাবছে। শিক্ষাবিদদের মতে, এই অর্থনীতি আগামী প্রজন্মের মেধা ধ্বংস করে দিচ্ছে। কলেজ শিক্ষক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট উম্মে হাবিবা বলেন, খেলার ছলে শুরু হওয়া এই বিনোদন পুরো শৈশবকে এক অলিখিত ঋণ ও জুয়ার চোরাবালিতে আটকে ফেলছে।

খেলার আড়ালে ‘মাইক্রো-ক্যাসিনো’ ও সমবয়সীদের চাপ
শ্রেণিকক্ষের এই অমনোযোগিতার উৎস খুঁজতে গিয়ে দেখা যায় গুগল প্লে-স্টোরে সাধারণ অ্যাকশন গেম হিসেবে থাকা ফ্রি-ফায়ার বা পাবজির মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর অভ্যন্তরীণ রূপান্তর। ফ্রি-ফায়ারের ‘ডায়মন্ড’ কিংবা পাবজির ‘ইউসি’ মূলত কিশোরদের পকেট কাটার ফাঁদ। এর ভেতরের ‘লুট বক্স’ বা ‘লাকি স্পিন’ ক্যাসিনোর আধুনিক সংস্করণ ছাড়া কিছুই নয়, যেখানে ক্ষণিকের মোহে পরিবার অজান্তেই খোয়াচ্ছে হাজার হাজার টাকা। এমনকি পারিবারিক লুডো খেলার অ্যাপেও এখন কয়েন বাজি ধরে ম্যাচ হচ্ছে।

কিশোররা প্রথমে ডিজিটাল কয়েন দিয়ে ‘কাস্টম রুম’ তৈরি করে এবং মেসেঞ্জার বা টেলিগ্রাম গ্রুপে ছড়িয়ে দেয় গোপন কোড। “১০ টাকায় ১০০০ টাকা জেতা যাবে”-এমন চটকদার প্রলোভন দেখিয়ে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে ৫০ থেকে ১০০ টাকা এন্ট্রি ফি নেওয়া হয়। ম্যাচ শেষে সংগৃহীত টাকার বড় অংশ পায় বিজয়ী, আর বাকিটা কমিশন হিসেবে কেটে রাখে আয়োজক কিশোর চক্র। ফলে মুঠোফোনটি রূপ নিচ্ছে পকেট ক্যাসিনোয়, যা সদ্য পাস হওয়া ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’-এর দৃষ্টিতে স্পষ্টত বেআইনি। বাজিতে টাকা হেরে কিশোররা ভয় ও অস্থিরতায় ভোগে, আর সেই খোয়ানো টাকা পরিবারের কাছে লুকানোর মরিয়া চেষ্টা থেকেই তারা পুনরায় ধাবিত হয় নতুন বাজির দিকে। তাছাড়া ভার্চুয়াল আইডিতে দামি পোশাক না থাকলে ‘বট’ বা ‘নুব’ বলে তুচ্ছ করা হয়, যা তাদের আত্মসম্মানে আঘাত হানে, ফলে তারা যেকোনো উপায়ে টাকা জোগাড় করে থাকে।

কিশোর মহাজনি চক্র
অনুসন্ধানে জানা যায়, শুরুতে টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে কিংবা বই কেনার মিথ্যা অজুহাতে পরিবারের কাছ থেকে টাকা নেয় শিশুরা। কাস্টম রুম আর স্পিনে সেই টাকা ফুরিয়ে গেলেই শুরু হয় সংকট। তখন পাড়ার বড় ভাইদের কাছ থেকে চড়া সুদে ধার নিতে শুরু করে কিশোররা। সময়মতো টাকা ফেরত না পেলে আসে হুমকি ও মানসিক চাপ। বাধ্য হয়ে তারা নিজের ব্যবহারের সাইকেল, মুঠোফোন বা হাতঘড়ি বন্ধক রাখে। দেনা শোধ করতে গিয়ে অনেকে চুরি এমনকি কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধেও জড়াচ্ছে। ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থী জানায়, পঞ্চাশ-একশ টাকা দিয়ে শুরু হলেও দেনা একসময় কয়েক হাজারে ঠেকে; বাধ্য হয়ে প্রিয় সাইকেলটি নামমাত্র দামে তুলে দিতে হয় মহাজনের হাতে। শিক্ষকরাও বলছেন, ক্লাসে ঝিমানো আর টিফিনে গেমের বাজি নিয়ে হাতাহাতি এখন কিশোরদের নিত্যদিনের ঘটনা।

অপরাধের আড়ালে গেমিং ফাঁদ: সংশোধন কেন্দ্রের সতর্কবার্তা

পর্দার এই ঋণ আর ভার্চুয়াল উন্মাদনা কীভাবে কিশোরদের আইনের সাথে সংঘাতে জড়াচ্ছে, তার সুস্পষ্ট যোগসূত্র মেলে সংশোধনাগারের নথিতে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের গাজীপুর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের সুপারিনটেনডেন্ট মো. এমরান খান জানান, গেমিংয়ে টাকা খোয়ানোর বিষয়টি হয়তো সরাসরি মামলার এজাহারে লেখা থাকে না, কিন্তু অপরাধের মূলে এটি অন্যতম প্রধান প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। খেলতে খেলতে কিশোররা তীব্র নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সেই নেশার অর্থ জোগাড় ও নৈতিক অবক্ষয়ের শেষ ধাপে তাদের নীতিবোধ বিনষ্ট হয়; যার ফলে তারা ছিনতাই, ডাকাতি, এমনকি হত্যাকাণ্ড বা ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। তিনি উল্লেখ করেন, অপরাধে জড়ানো কিশোরদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যেই অনিয়ন্ত্রিত মুঠোফোন ও অনলাইন গেম ব্যবহারের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। মহামারির সময়ে পড়ালেখার প্রয়োজনে দেওয়া ডিভাইসের লাগামহীন ব্যবহার এই সংকটকে নিয়ন্ত্রণহীন করে তুলেছে।

ইনফ্লুয়েন্সারদের চটকদার প্রচারণা ও প্রমোকোডের ফাঁদে আইন লঙ্ঘন

কিশোরদের এই অপরাধের চোরাবালিতে ঠেলে দেওয়ার পেছনে অন্যতম বড় ভূমিকা রাখছে ফেসবুক ও ইউটিউবের একশ্রেণির গেম স্ট্রিমার ও ইনফ্লুয়েন্সার। লাইভ খেলার সময় তারা কম দামে ডায়মন্ড দেওয়ার প্রলোভন দেখায় এবং বিভিন্ন ‘প্রোমো কোড’ প্রচার করে দাবি করে যে এটি ব্যবহার করলে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত বোনাস মিলবে। অথচ ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’-এর ধারা ১১ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জুয়ার প্রচার চালানো দণ্ডনীয় অপরাধ। আইনের ২২ ধারা অনুযায়ী এর সাজা ৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড। কিন্তু কার্যকর আইনি তদারকির অভাবে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ্যেই চলছে এই প্রলোভনের বিস্তার।

ডোপামিনের বিষাক্ত ফাঁদ: অপরিণত মস্তিষ্কে স্থায়ী ক্ষত
আইনের এই লঙ্ঘনের চেয়েও ভয়ংকর ক্ষত তৈরি হচ্ছে বাড়ন্ত কিশোরদের মনস্তত্ত্ব ও স্নায়ুতন্ত্রে। ভার্চুয়াল মুদ্রা ও বাজির প্রভাব মস্তিষ্কে কীভাবে স্থায়ী রোগ তৈরি করে, তার চিকিৎসাগত ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মুনিম রেজা বলেন, “কিশোর বয়সে মানুষের মস্তিষ্কের ‘প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স’ অংশটি পুরোপুরি গঠিত হয় না, যা আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও ভালো-মন্দের সিদ্ধান্ত নেয়। গেমের ভেতরে যখন স্পিন ঘুরিয়ে আকস্মিক জয়ের প্রলোভন দেখানো হয়, তখন মস্তিষ্কে তীব্র ডোপামিন ক্ষরণ হয়, যা তাকে মারাত্মক আসক্তির দিকে ঠেলে দেয়। আর খেলায় হেরে গেলে শরীরে ‘কর্টিসোল’-এর মতো ক্ষতিকর মানসিক চাপের হরমোন মাত্রাতিরিক্ত নিঃসৃত হয়। তখন সে আক্রমণাত্মক আচরণ করে ।”

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)-এর তথ্যমতে, অতিরিক্ত গেমিং শিশুদের স্বাভাবিক ঘুমের চক্র সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. এস এম আবুল কালাম আজাদের গবেষণায় উঠে এসেছে, ডিজিটাল গেম খেলা কিশোরদের ৩০.৩ শতাংশ তীব্র আসক্তিতে এবং ৫০.৫ শতাংশ মানসিক পীড়নে ভুগছে। আঁচল ফাউন্ডেশনের সমীক্ষা বলছে, গেমের ডায়মন্ড কেনার টাকা না পেয়ে কিংবা পরিবার বাধা দেওয়ায় অনেক কিশোর আত্মহত্যার পথও বেছে নিয়েছে।

গেমিং কারেন্সির কালোবাজার: কিশোর হতাশ, নিঃস্ব পরিবার, লাভবান চক্র
যে ভার্চুয়াল মুদ্রার জন্য শিশুদের এই মানসিক বিপর্যয়, তা কেনার জন্য দেশে গড়ে উঠেছে এক সুসংগঠিত কালোবাজারি চক্র। স্কুলের সামনের ফটোকপি বা মোবাইল রিচার্জের দোকানে কোনো বয়স যাচাই ছাড়াই দেদারসে বিক্রি হচ্ছে ডায়মন্ড ও টপ-আপ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুমিল্লার এক বিক্রেতা জানান, প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থী তাদের কাছে আসে এবং প্রতিদিনের লেনদেন হাজার হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়।

এই ভার্চুয়াল মুদ্রার হাত ধরেই কিশোররা পরে সিকে৪৪, বিজিডি৬৬, কিউ৮৮৮০-এর মতো অনিবন্ধিত অনলাইন গেম এবং ওয়ানএক্সবেট, মেলবেট, বেট৩৬৫-এর মতো আন্তর্জাতিক বেটিং প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হচ্ছে। সাইটগুলো বন্ধ থাকলে ভিপিএন বা বিকল্প এপিকে ফাইল ব্যবহার করে বাজি ধরা হচ্ছে, যার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা হুন্ডির পথে পাচার হয়ে যাচ্ছে দেশের বাইরে।

কিশোরদের এই অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেন প্রসঙ্গে দেশের কয়েকটি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করা হলেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা ও নীতিনির্ধারকদের দায়
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, দেশজুড়ে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের বিস্তার ঘটলেও শিশুদের সুরক্ষায় কোনো কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক বলয় গড়ে ওঠেনি। বিটিআরসি ও সিআইডি পাঁচ সহস্রাধিক অনলাইন জুয়ার সাইট বন্ধ করেছে এবং বিএফআইইউ জব্দ করেছে হাজার হাজার এমএফএস অ্যাকাউন্ট। তবে এসব পদক্ষেপের পুরোটাই প্রাপ্তবয়স্কদের সরাসরি ক্যাসিনো সাইটকেন্দ্রিক। অনলাইন গেমের আড়ালে শিশুদের ভার্চুয়াল মুদ্রা কেনাবেচা ও বাজি ধরার বিষয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্যভাণ্ডার বা প্রতিরোধ সেল নেই। এমনকি এমএফএসের মাধ্যমে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ইন-গেম পারচেজ বা ভাউচার কেনা ঠেকানোর মতো কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনাও দেয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা বিটিআরসি। শিশু একাডেমি বা সমাজসেবা অধিদপ্তরের মতো সংস্থাগুলোর কাছেও এই ক্ষতিকর ভার্চুয়াল অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি উপেক্ষিত।

কড়া আইন, তবু ফাঁকফোকর: সুরক্ষাহীন শৈশব
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও কুমিল্লা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ বদিউল আলম সুজন বলেন, “সদ্য পাস হওয়া ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ এবং ‘শিশু আইন, ২০১৩’-এর মধ্যে বড় ধরনের সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। নতুন আইনে অনলাইন জুয়া নিষিদ্ধ হলেও ভিডিও গেমসের অভ্যন্তরীণ ‘লুট বক্স’ বা ভার্চুয়াল কয়েন কেনাবেচাকে সরাসরি জুয়ার আওতায় আনা হয়নি। ফলে এই বড় আইনি ফাঁকফোকর রয়েই গেছে। এছাড়া জুয়া আইনে আয়োজকদের শাস্তির বিধান থাকলেও যেসব শিশু ভুক্তভোগী হয়ে ঋণের দায়ে অপরাধে জড়াচ্ছে, তাদের আদালতে না নিয়ে বাধ্যতামূলক মানসিক কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের আইনি ফ্রেমওয়ার্ক থাকা দরকার।” তিনি হাইকোর্টের আদেশের মাধ্যমে গেমের এসব জুয়া সুলভ অ্যালগরিদম বন্ধের এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের লেনদেন ঠেকাতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দায় স্পষ্ট করার দাবি জানান।

অন্যদিকে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির পরিচালক (অপারেশন) মো. হোসেন বিন আমিন জানান, “নাগরিকদের বিভিন্ন সাইবার অভিযোগ গ্রহণের জন্য এজেন্সির নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম কার্যকর রয়েছে। কোনো ক্ষতিকর বা জুয়ার ওয়েবসাইট বন্ধের অনুরোধ বা সুপারিশ এলে তা যাচাই করে আমরা বন্ধের ব্যবস্থা নেই। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—আমরা ১০টি বা ২০টি সাইট বন্ধ করলে চক্রগুলো প্রতিনিয়ত নতুন ডোমেইন বা পদ্ধতি তৈরি করে ফেলে। ফলে একটা বন্ধ করলে আরেকটা খোলে। একারণে শুধু ব্লকিং দিয়ে হবে না; বিটিআরসি, আইএসপি এবং আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সমন্বিত রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।”

সংকটজয়ের বৈশ্বিক ও দেশীয় সমাধান
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডস ইতিমধ্যে ভিডিও গেমসের ভেতর অর্থের বিনিময়ে ‘লুট বক্স’ কেনাকে পুরোপুরি জুয়া হিসেবে ঘোষণা দিয়ে নিষিদ্ধ করেছে। অস্ট্রেলিয়াতেও অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এ ধরণের গেমসে বয়সসীমা কঠোরভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা একমত যে কেবল কঠোরভাবে ফোন কেড়ে নিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির পরিচালক মো. হোসেন বিন আমিন জানান, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারে প্রশিক্ষণ দিতে ৬৪ জেলায় সরকারের একটি সচেতনতামূলক প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। তবে তাঁর মতে, পরিবারের ভেতরে রাষ্ট্রের নজরদারি সম্ভব নয়; তাই অভিভাবকদের প্যারেন্টাল কন্ট্রোল টুলস ব্যবহার করে সন্তানের অনলাইন গতিবিধির ওপর সজাগ থাকতে হবে। গাজীপুর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের সুপারিনটেনডেন্ট মো. এমরান খান মনে করেন, শিশুদের জন্য ইন্টারনেটে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে কঠোর সুরক্ষা নীতি থাকা অপরিহার্য।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশেও ভিডিও গেমসে টাকার বিনিময়ে যেকোনো ধরনের স্পিন, লুট বক্স কিংবা ভার্চুয়াল মুদ্রা কেনার সুবিধা অবিলম্বে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা জরুরি। একই সাথে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গেমিং কারেন্সি কেনাবেচায় জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি অভিভাবকদের দ্বি-স্তরীয় বায়োমেট্রিক ওটিপি অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা সময়ের দাবি। নিছক প্রযুক্তিগত নজরদারি বা সাময়িক সাইট বন্ধ করে এই চোরাবালি থেকে পরবর্তী প্রজন্মকে বাঁচানো সম্ভব নয়। পাড়া-মহল্লায় হারিয়ে যাওয়া খেলার মাঠ পুনরুদ্ধার, উন্মুক্ত ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পুনরুজ্জীবন ঘটিয়ে মুঠোফোনের বন্দিদশা থেকে শিশুদের মুক্ত করাই এখন রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ভার্চুয়াল পর্দার কৃত্রিম ডোপামিন নয়, মুক্ত বাতাসের স্বাভাবিক আনন্দই কেবল পারে অবরুদ্ধ এই শৈশবকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে।