প্রশংসার পুতুলনাচ

  • আপডেটের সময়: ০৭:১৫:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 177

প্রশংসার পুতুলনাচ
প্রিন্সিপাল মোঃ বিল্লাল হোসেন

মঞ্চে আলো জ্বলে,
পর্দা ওঠে ধীরে—
মাঝখানে সিংহাসন,
চারদিকে নত মাথার সারি।

সিংহাসনে বসা মানুষটি নীরব;
তাঁর নীরবতারও
একটি ভাষা আছে।

পর্দার আড়াল থেকে
সুতোয় টান পড়ে।

এক পুতুল বলে—
“মহান!”

অন্যটি মাথা নোয়ায়—
“অতুলনীয়!”

আরেকটি যোগ করে—
“ইতিহাস আপনাকে মনে রাখবে!”

ইতিহাস চুপচাপ বসে থাকে—
তার হাতে কোনো মাইক নেই।

পুতুলেরা শুধু মুখ খোলে,
শব্দ আসে পর্দার আড়াল থেকে;
সিংহাসন মুচকি হাসে—
যেন প্রশংসাই আজ
তার রাজমুকুটের বৈধতা।

তালি পড়ে।
তালির শব্দে
বিবেকের ক্ষীণ কণ্ঠ
আরও দূরে সরে যায়।

কেউ দেখে না
সুতো কোথায় বাঁধা,
কেউ জানতে চায় না—
কণ্ঠের মালিক কে।

এ মঞ্চে
যোগ্যতার প্রমাণপত্র লাগে না;
প্রয়োজন শুধু
সঠিক সময়ে
সঠিক বিশেষণ।

যে যত কাছে,
তার প্রশংসা তত দীর্ঘ;
যে যত নত,
তার কণ্ঠ তত উচ্চ।

সত্য এখানে অতিথি মাত্র—
তাকে বসতে দেওয়া হয়,
কিন্তু মাইক্রোফোন দেওয়া হয় না।

পর্দার আড়ালে
প্রতিদিন মহড়া চলে—

আজ “মহান”,
কাল “অপরাজেয়”,
পরশু হয়তো—
“জাতির শেষ আশ্রয়”!

শব্দের মুদ্রাস্ফীতিতে
বিশেষণেরও দাম কমে যায়;
তবু সিংহাসন
নিজেকে আরও উঁচু ভাবে।

কারণ নিজের মুখে
নিজের গৌরব বলা হাস্যকর;
পুতুলের মুখে শুনলে
সেটিই হয়ে ওঠে
রাজকীয় সত্য।

এভাবেই
একজন মানুষকে ঘিরে
তৈরি হয় কৃত্রিম আকাশ—
মেঘ নেই, বৃষ্টি নেই,
শুধু সাজানো বজ্রধ্বনি।

কিন্তু
কোনো মঞ্চই চিরস্থায়ী নয়।

একদিন
শেষ ঘণ্টা বাজে।

পর্দা নামে।
আলো নিভে যায়।
পুতুলেরা থেমে থাকে
নিজ নিজ ভঙ্গিমায়।

সুতো গুটিয়ে যায়—
সঙ্গে গুটিয়ে যায়
মহিমার মহড়াও।

দর্শক ফিরে যায়।
তালি মরে যায়
খালি মঞ্চের অন্ধকারে।

সিংহাসনের সামনে
তখন শুধু একটি আয়না।

সে কোনো উপাধি দেয় না,
কোনো তালি বাজায় না—
শুধু ফিরিয়ে দেয়
একটি মুখ।

সেই মুখে নেই
“মহান”,
নেই “অতুলনীয়”—
আছে শুধু একজন মানুষ,
যার চারপাশে
আর কোনো সুতো নেই।

তখন বোঝা যায়—

এতক্ষণ যে মানুষটি
আকাশ ছুঁয়ে বসেছিলেন,
তিনি আকাশে ছিলেন না;
আলো তাঁকে সেখানে
এঁকে রেখেছিল।

পুতুলের কণ্ঠে
যে মহিমা দেবতার মতো শোনাত,
তা আসলে ছিল—
সুতোর শব্দ।

পর্দা নামলেই
দেবতা মানুষ হয়ে যায়,
সিংহাসন কাঠ হয়ে যায়,
আর করতালি—
শুধু পুরোনো প্রতিধ্বনি।

শেষ পর্যন্ত
ক্ষমতার সবচেয়ে বড় আয়না
মানুষ নয়—
সময়।

সে একদিন
সব সুতো ছিঁড়ে দেয়,
সব আলো নিভিয়ে দেয়,
সব উপাধি খুলে নেয়।

তারপর মঞ্চে থাকে শুধু—

একজন মানুষ,
একটি মুখ,
আর আসল সত্য।

ট্যাগ :

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন


প্রশংসার পুতুলনাচ

আপডেটের সময়: ০৭:১৫:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রশংসার পুতুলনাচ
প্রিন্সিপাল মোঃ বিল্লাল হোসেন

মঞ্চে আলো জ্বলে,
পর্দা ওঠে ধীরে—
মাঝখানে সিংহাসন,
চারদিকে নত মাথার সারি।

সিংহাসনে বসা মানুষটি নীরব;
তাঁর নীরবতারও
একটি ভাষা আছে।

পর্দার আড়াল থেকে
সুতোয় টান পড়ে।

এক পুতুল বলে—
“মহান!”

অন্যটি মাথা নোয়ায়—
“অতুলনীয়!”

আরেকটি যোগ করে—
“ইতিহাস আপনাকে মনে রাখবে!”

ইতিহাস চুপচাপ বসে থাকে—
তার হাতে কোনো মাইক নেই।

পুতুলেরা শুধু মুখ খোলে,
শব্দ আসে পর্দার আড়াল থেকে;
সিংহাসন মুচকি হাসে—
যেন প্রশংসাই আজ
তার রাজমুকুটের বৈধতা।

তালি পড়ে।
তালির শব্দে
বিবেকের ক্ষীণ কণ্ঠ
আরও দূরে সরে যায়।

কেউ দেখে না
সুতো কোথায় বাঁধা,
কেউ জানতে চায় না—
কণ্ঠের মালিক কে।

এ মঞ্চে
যোগ্যতার প্রমাণপত্র লাগে না;
প্রয়োজন শুধু
সঠিক সময়ে
সঠিক বিশেষণ।

যে যত কাছে,
তার প্রশংসা তত দীর্ঘ;
যে যত নত,
তার কণ্ঠ তত উচ্চ।

সত্য এখানে অতিথি মাত্র—
তাকে বসতে দেওয়া হয়,
কিন্তু মাইক্রোফোন দেওয়া হয় না।

পর্দার আড়ালে
প্রতিদিন মহড়া চলে—

আজ “মহান”,
কাল “অপরাজেয়”,
পরশু হয়তো—
“জাতির শেষ আশ্রয়”!

শব্দের মুদ্রাস্ফীতিতে
বিশেষণেরও দাম কমে যায়;
তবু সিংহাসন
নিজেকে আরও উঁচু ভাবে।

কারণ নিজের মুখে
নিজের গৌরব বলা হাস্যকর;
পুতুলের মুখে শুনলে
সেটিই হয়ে ওঠে
রাজকীয় সত্য।

এভাবেই
একজন মানুষকে ঘিরে
তৈরি হয় কৃত্রিম আকাশ—
মেঘ নেই, বৃষ্টি নেই,
শুধু সাজানো বজ্রধ্বনি।

কিন্তু
কোনো মঞ্চই চিরস্থায়ী নয়।

একদিন
শেষ ঘণ্টা বাজে।

পর্দা নামে।
আলো নিভে যায়।
পুতুলেরা থেমে থাকে
নিজ নিজ ভঙ্গিমায়।

সুতো গুটিয়ে যায়—
সঙ্গে গুটিয়ে যায়
মহিমার মহড়াও।

দর্শক ফিরে যায়।
তালি মরে যায়
খালি মঞ্চের অন্ধকারে।

সিংহাসনের সামনে
তখন শুধু একটি আয়না।

সে কোনো উপাধি দেয় না,
কোনো তালি বাজায় না—
শুধু ফিরিয়ে দেয়
একটি মুখ।

সেই মুখে নেই
“মহান”,
নেই “অতুলনীয়”—
আছে শুধু একজন মানুষ,
যার চারপাশে
আর কোনো সুতো নেই।

তখন বোঝা যায়—

এতক্ষণ যে মানুষটি
আকাশ ছুঁয়ে বসেছিলেন,
তিনি আকাশে ছিলেন না;
আলো তাঁকে সেখানে
এঁকে রেখেছিল।

পুতুলের কণ্ঠে
যে মহিমা দেবতার মতো শোনাত,
তা আসলে ছিল—
সুতোর শব্দ।

পর্দা নামলেই
দেবতা মানুষ হয়ে যায়,
সিংহাসন কাঠ হয়ে যায়,
আর করতালি—
শুধু পুরোনো প্রতিধ্বনি।

শেষ পর্যন্ত
ক্ষমতার সবচেয়ে বড় আয়না
মানুষ নয়—
সময়।

সে একদিন
সব সুতো ছিঁড়ে দেয়,
সব আলো নিভিয়ে দেয়,
সব উপাধি খুলে নেয়।

তারপর মঞ্চে থাকে শুধু—

একজন মানুষ,
একটি মুখ,
আর আসল সত্য।