বেকার তরুণ ও বিদেশমুখী স্বপ্ন: বাংলাদেশের উন্নয়নের সামনে নীরব সংকট

  • আপডেটের সময়: ০২:০৫:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬
  • / 496

মোঃ মাহমুদুল হাসান:

বাংলাদেশকে প্রায়ই “তরুণদের দেশ” বলা হয়। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ কর্মক্ষম বয়সের তরুণ। (বাংলাদেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যা বলতে সাধারণত ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সের মানুষকে বোঝানো হয়, যারা কাজ করতে সক্ষম।) ২০২৫ সালের জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) এবং বিভিন্ন জনমিতিক প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যা (১৭ কোটি ৫৭ লক্ষ) এর মধ্যে ১১ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষ কর্মক্ষম বয়সের, অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এমন জনসংখ্যাগত পরিস্থিতি একটি দেশের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করে, যাকে বলা হয় ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড। যদি এই তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে উৎপাদনশীল অর্থনীতিতে যুক্ত করা যায়, তাহলে একটি দেশ দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে (Bloom, Canning, & Sevilla, 2003)। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। দেশের বহু তরুণ আজ বেকারত্বের সমস্যায় জর্জরিত। তবে এর মধ্যে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশি । একই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সংখ্যক তরুণ বিদেশমুখী হয়ে উঠছে। উন্নত জীবনের আশায় অনেকেই উচ্চশিক্ষা, দক্ষ শ্রম কিংবা অভিবাসনের বিভিন্ন পথ অনুসরণ করছেন। এই প্রবণতা একদিকে যেমন ব্যক্তিগত স্বপ্ন ও সম্ভাবনার প্রতিফলন, অন্যদিকে তা রাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্নও তৈরি করছে-দেশের তরুণ শক্তিকে কীভাবে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানো যাবে?

তরুণ জনগোষ্ঠী: সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশই কর্মক্ষম বয়সের মধ্যে রয়েছে। দেশের শ্রমবাজারে প্রতি বছর নতুন করে বিপুল সংখ্যক তরুণ প্রবেশ করছে। কিন্তু শ্রমবাজারে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সেই অনুপাতে বৃদ্ধি পাচ্ছে না। ফলে শিক্ষিত তরুণদের একটি অংশ দীর্ঘ সময় ধরে বেকার থেকে যাচ্ছে।
Bangladesh Bureau of Statistics-এর শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনকারী অনেক তরুণ চাকরি পাওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে বাধ্য হন।এই পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা সৃষ্টি করে না; এটি সামাজিক ও মানসিক প্রভাবও তৈরি করে। দীর্ঘ সময় ধরে কর্মসংস্থান না পাওয়ার কারণে অনেক তরুণ হতাশায় ভুগতে শুরু করেন। একই সঙ্গে পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশার চাপ তাদের মানসিক চাপকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

বিদেশমুখী তরুণ: একটি নতুন বাস্তবতা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে বিদেশে যাওয়ার আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষা বা কাজের সুযোগ খুঁজছেন অনেক তরুণ। কেউ কেউ দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে বিদেশে যাচ্ছেন, আবার অনেকেই শ্রমবাজারের নিম্নস্তরের কাজেও যুক্ত হচ্ছেন।

এই প্রবণতার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।
প্রথমত, অর্থনৈতিক সুযোগের পার্থক্য। উন্নত দেশগুলোতে শ্রমের মূল্য তুলনামূলকভাবে বেশি এবং জীবনযাত্রার মানও উন্নত। ফলে অনেক তরুণ মনে করেন, বিদেশে গেলে তাদের আর্থিক ভবিষ্যৎ দ্রুত উন্নত হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, দেশের শ্রমবাজারে দক্ষতা ও শিক্ষার মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে শিক্ষিত তরুণদের একটি অংশ চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যার সম্মুখীন হয় (ILO, 2022).

তৃতীয়ত, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের কেউ বা পরিচিত কেউ বিদেশে সফল হলে অন্যরাও সেই পথ অনুসরণ করতে আগ্রহী হন।

ব্রেন ড্রেইন: উন্নয়নের জন্য নীরব হুমকি

তরুণদের বিদেশমুখী হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্রেন ড্রেইন বা মেধা পাচার। যখন একটি দেশের শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ বিদেশে চলে যায়, তখন সেই দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় একটি ঘাটতি তৈরি হতে পারে।

World Bank-এর বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে দক্ষ মানবসম্পদের বিদেশে চলে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে (World Bank, 2023).

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই বিষয়টি প্রাসঙ্গিক। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী তৈরি করছে। কিন্তু তাদের একটি অংশ যদি বিদেশে স্থায়ীভাবে চলে যায়, তাহলে দেশের অভ্যন্তরে দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।

রেমিট্যান্স: ইতিবাচক দিক

তবে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের অবদানও কম নয়। প্রবাসীরা প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠান। এই রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

Bangladesh Bank-এর তথ্য অনুযায়ী, রেমিট্যান্স বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস।
রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে এবং বহু পরিবারের জীবনমান উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে শুধুমাত্র রেমিট্যান্সের উপর নির্ভর করে একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

কর্মসংস্থান সৃষ্টির নতুন পথ

তরুণদের বেকারত্ব সমস্যার সমাধানের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পায়ন, প্রযুক্তি খাতের সম্প্রসারণ এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ফ্রিল্যান্সিং ও ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে অনেক তরুণ নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি করেছেন। এই খাতকে আরও উন্নত করা গেলে তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে।

এছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতও কর্মসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে এই খাত অর্থনীতির একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের প্রয়োজন

তরুণদের কর্মসংস্থানের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষাব্যবস্থা এখনও তাত্ত্বিক জ্ঞানের উপর বেশি নির্ভরশীল। অথচ আধুনিক শ্রমবাজারে প্রযুক্তিগত দক্ষতা, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ইন্টার্নশিপ, গবেষণা এবং শিল্পখাতের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো হলে শিক্ষার্থীরা বাস্তব কর্মক্ষেত্র সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারে।

তরুণ উদ্যোক্তা: সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, বরং উদ্যোক্তা হিসেবেও গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশে তরুণ উদ্যোক্তারা অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন।

বাংলাদেশেও যদি তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ, প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা যায়, তাহলে তারা নতুন ব্যবসা শুরু করতে উৎসাহিত হবে। এর মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।

বাংলাদেশের তরুণ সমাজ দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাদের শক্তি, উদ্যম ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগাতে পারলে দেশ দ্রুত উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারে। কিন্তু বেকারত্ব এবং বিদেশমুখী প্রবণতা যদি ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তাই এখনই প্রয়োজন পরিকল্পিত নীতি গ্রহণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার এবং দক্ষতা উন্নয়নের উপর জোর দেওয়া। তাহলেই বাংলাদেশের তরুণরা বিদেশে যাওয়ার স্বপ্নের পাশাপাশি নিজেদের দেশেই ভবিষ্যৎ গড়ার সম্ভাবনা দেখতে পারবে।

লেখকঃ প্রভাষক, তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

তথ্যসূত্র
1. Bloom, D. E., Canning, D., & Sevilla, J. (2003). The demographic dividend: A new perspective on the economic consequences of population change. Population Matters. https://doi.org/10.7249/mr1274
2. International Labour Organization. (2022). Global employment trends for youth 2022. https://doi.org/10.54394/TJZV7418
3. World Bank. (2023). Migration and development brief. https://doi.org/10.1596/978-1-4648-1946-7
4. Bangladesh Bureau of Statistics. (2023). Labour Force Survey 2022. Dhaka: BBS.
5. Bangladesh Bank. (2024). Monthly remittance report. Dhaka: Bangladesh Bank.

ট্যাগ :

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন


বেকার তরুণ ও বিদেশমুখী স্বপ্ন: বাংলাদেশের উন্নয়নের সামনে নীরব সংকট

আপডেটের সময়: ০২:০৫:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬

মোঃ মাহমুদুল হাসান:

বাংলাদেশকে প্রায়ই “তরুণদের দেশ” বলা হয়। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ কর্মক্ষম বয়সের তরুণ। (বাংলাদেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যা বলতে সাধারণত ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সের মানুষকে বোঝানো হয়, যারা কাজ করতে সক্ষম।) ২০২৫ সালের জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) এবং বিভিন্ন জনমিতিক প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যা (১৭ কোটি ৫৭ লক্ষ) এর মধ্যে ১১ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষ কর্মক্ষম বয়সের, অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এমন জনসংখ্যাগত পরিস্থিতি একটি দেশের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করে, যাকে বলা হয় ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড। যদি এই তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে উৎপাদনশীল অর্থনীতিতে যুক্ত করা যায়, তাহলে একটি দেশ দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে (Bloom, Canning, & Sevilla, 2003)। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। দেশের বহু তরুণ আজ বেকারত্বের সমস্যায় জর্জরিত। তবে এর মধ্যে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশি । একই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সংখ্যক তরুণ বিদেশমুখী হয়ে উঠছে। উন্নত জীবনের আশায় অনেকেই উচ্চশিক্ষা, দক্ষ শ্রম কিংবা অভিবাসনের বিভিন্ন পথ অনুসরণ করছেন। এই প্রবণতা একদিকে যেমন ব্যক্তিগত স্বপ্ন ও সম্ভাবনার প্রতিফলন, অন্যদিকে তা রাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্নও তৈরি করছে-দেশের তরুণ শক্তিকে কীভাবে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানো যাবে?

তরুণ জনগোষ্ঠী: সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশই কর্মক্ষম বয়সের মধ্যে রয়েছে। দেশের শ্রমবাজারে প্রতি বছর নতুন করে বিপুল সংখ্যক তরুণ প্রবেশ করছে। কিন্তু শ্রমবাজারে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সেই অনুপাতে বৃদ্ধি পাচ্ছে না। ফলে শিক্ষিত তরুণদের একটি অংশ দীর্ঘ সময় ধরে বেকার থেকে যাচ্ছে।
Bangladesh Bureau of Statistics-এর শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনকারী অনেক তরুণ চাকরি পাওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে বাধ্য হন।এই পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা সৃষ্টি করে না; এটি সামাজিক ও মানসিক প্রভাবও তৈরি করে। দীর্ঘ সময় ধরে কর্মসংস্থান না পাওয়ার কারণে অনেক তরুণ হতাশায় ভুগতে শুরু করেন। একই সঙ্গে পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশার চাপ তাদের মানসিক চাপকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

বিদেশমুখী তরুণ: একটি নতুন বাস্তবতা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে বিদেশে যাওয়ার আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষা বা কাজের সুযোগ খুঁজছেন অনেক তরুণ। কেউ কেউ দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে বিদেশে যাচ্ছেন, আবার অনেকেই শ্রমবাজারের নিম্নস্তরের কাজেও যুক্ত হচ্ছেন।

এই প্রবণতার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।
প্রথমত, অর্থনৈতিক সুযোগের পার্থক্য। উন্নত দেশগুলোতে শ্রমের মূল্য তুলনামূলকভাবে বেশি এবং জীবনযাত্রার মানও উন্নত। ফলে অনেক তরুণ মনে করেন, বিদেশে গেলে তাদের আর্থিক ভবিষ্যৎ দ্রুত উন্নত হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, দেশের শ্রমবাজারে দক্ষতা ও শিক্ষার মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে শিক্ষিত তরুণদের একটি অংশ চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যার সম্মুখীন হয় (ILO, 2022).

তৃতীয়ত, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের কেউ বা পরিচিত কেউ বিদেশে সফল হলে অন্যরাও সেই পথ অনুসরণ করতে আগ্রহী হন।

ব্রেন ড্রেইন: উন্নয়নের জন্য নীরব হুমকি

তরুণদের বিদেশমুখী হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্রেন ড্রেইন বা মেধা পাচার। যখন একটি দেশের শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ বিদেশে চলে যায়, তখন সেই দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় একটি ঘাটতি তৈরি হতে পারে।

World Bank-এর বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে দক্ষ মানবসম্পদের বিদেশে চলে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে (World Bank, 2023).

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই বিষয়টি প্রাসঙ্গিক। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী তৈরি করছে। কিন্তু তাদের একটি অংশ যদি বিদেশে স্থায়ীভাবে চলে যায়, তাহলে দেশের অভ্যন্তরে দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।

রেমিট্যান্স: ইতিবাচক দিক

তবে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের অবদানও কম নয়। প্রবাসীরা প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠান। এই রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

Bangladesh Bank-এর তথ্য অনুযায়ী, রেমিট্যান্স বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস।
রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে এবং বহু পরিবারের জীবনমান উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে শুধুমাত্র রেমিট্যান্সের উপর নির্ভর করে একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

কর্মসংস্থান সৃষ্টির নতুন পথ

তরুণদের বেকারত্ব সমস্যার সমাধানের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পায়ন, প্রযুক্তি খাতের সম্প্রসারণ এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ফ্রিল্যান্সিং ও ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে অনেক তরুণ নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি করেছেন। এই খাতকে আরও উন্নত করা গেলে তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে।

এছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতও কর্মসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে এই খাত অর্থনীতির একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের প্রয়োজন

তরুণদের কর্মসংস্থানের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষাব্যবস্থা এখনও তাত্ত্বিক জ্ঞানের উপর বেশি নির্ভরশীল। অথচ আধুনিক শ্রমবাজারে প্রযুক্তিগত দক্ষতা, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ইন্টার্নশিপ, গবেষণা এবং শিল্পখাতের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো হলে শিক্ষার্থীরা বাস্তব কর্মক্ষেত্র সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারে।

তরুণ উদ্যোক্তা: সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, বরং উদ্যোক্তা হিসেবেও গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশে তরুণ উদ্যোক্তারা অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন।

বাংলাদেশেও যদি তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ, প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা যায়, তাহলে তারা নতুন ব্যবসা শুরু করতে উৎসাহিত হবে। এর মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।

বাংলাদেশের তরুণ সমাজ দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাদের শক্তি, উদ্যম ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগাতে পারলে দেশ দ্রুত উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারে। কিন্তু বেকারত্ব এবং বিদেশমুখী প্রবণতা যদি ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তাই এখনই প্রয়োজন পরিকল্পিত নীতি গ্রহণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার এবং দক্ষতা উন্নয়নের উপর জোর দেওয়া। তাহলেই বাংলাদেশের তরুণরা বিদেশে যাওয়ার স্বপ্নের পাশাপাশি নিজেদের দেশেই ভবিষ্যৎ গড়ার সম্ভাবনা দেখতে পারবে।

লেখকঃ প্রভাষক, তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

তথ্যসূত্র
1. Bloom, D. E., Canning, D., & Sevilla, J. (2003). The demographic dividend: A new perspective on the economic consequences of population change. Population Matters. https://doi.org/10.7249/mr1274
2. International Labour Organization. (2022). Global employment trends for youth 2022. https://doi.org/10.54394/TJZV7418
3. World Bank. (2023). Migration and development brief. https://doi.org/10.1596/978-1-4648-1946-7
4. Bangladesh Bureau of Statistics. (2023). Labour Force Survey 2022. Dhaka: BBS.
5. Bangladesh Bank. (2024). Monthly remittance report. Dhaka: Bangladesh Bank.