বিনিয়োগ ফেরাতে ব্যবসায়ীদের আস্থা অর্জন ও ‘ভয়হীন পরিবেশ’ সৃষ্টির তাগিদ

  • আপডেটের সময়: ০৭:০৮:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
  • / 101

​বিশেষ প্রতিবেদক:

দীর্ঘ দুই দশক পর গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেছে বিএনপি সরকার। দেশের অর্থনীতি যখন এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—বিশেষ করে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের নানা নীতিগত স্থবিরতা, দারিদ্র্য বৃদ্ধি, বিনিয়োগে খরা, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে জনজীবন বিপর্যস্ত—ঠিক তখনই এই বাজেট পেশ করা হলো।

সংকটের এই মুহূর্তে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট জনমনে কিছুটা হলেও আশার সঞ্চার করেছে। বিশেষ করে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং বেসরকারি খাতের টেকসই উন্নয়নে বাজেটে কিছু সুনির্দিষ্ট ও বৈপ্লবিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

​যেকোনো অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণের প্রথম শর্ত হলো সমস্যার সঠিক উৎস চিহ্নিত করা। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেটে বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের কারণগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরেছেন। একই সাথে সংকট থেকে উত্তরণের জন্য যে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী। তিনি সঠিকভাবেই অনুধাবন করেছেন যে, ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরায় সচল করতে হলে বেসরকারি খাতকে পুনরুজ্জীবিত করার কোনো বিকল্প নেই। বহুমুখী সমস্যায় জর্জরিত বেসরকারি খাতই যে অর্থনৈতিক ঘুরে দাঁড়ানোর মূল চাবিকাঠি, তা এই বাজেটে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

পরিকল্পিত শিল্পায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং প্রযুক্তিভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসারের মাধ্যমে তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা এবং নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি করা এই বাজেটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
​নিয়মনীতি ও আইনি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার মাধ্যমে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রতা দূর করে একটি স্বচ্ছ, সহজ ও সাশ্রয়ী ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী। ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পুঁজিবাজারের প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করার লক্ষ্য রয়েছে।

​সামগ্রিকভাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে ব্যবসা ও বিনিয়োগ সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করা যায়। উৎসে করকে চূড়ান্ত অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করায় ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের একটি বড় দাবি পূরণ হয়েছে।

এছাড়া শিল্পের কাঁচামালে উৎসে কর ৪ শতাংশে হ্রাস, ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে উৎসে কর ০.৫ শতাংশ করা, আগামী ৫ বছরের কর কাঠামো আগাম ঘোষণা এবং স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক যানবাহন (EV) খাতে করছাড়ের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

ভ্যাটের হার না বাড়িয়ে করের পরিধি সম্প্রসারণ এবং ত্রৈমাসিক অনলাইন ভ্যাট রিটার্নের বিধান একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় সিএমএসএমই (CMSME) খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ৫০ লাখ টাকা ও নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের জন্য ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার করমুক্ত রাখা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।

পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ই-লোন (E-Loan) চালুর সিদ্ধান্ত প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের উজ্জীবিত করবে।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ফ্ল্যাট রেটে টার্নওভার কর ও আলাদা ভ্যাট রিটার্ন ফরম কর ব্যবস্থাপনাকে অনেক সহজতর করবে।

ট্যাগ :

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন


বিনিয়োগ ফেরাতে ব্যবসায়ীদের আস্থা অর্জন ও ‘ভয়হীন পরিবেশ’ সৃষ্টির তাগিদ

আপডেটের সময়: ০৭:০৮:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

​বিশেষ প্রতিবেদক:

দীর্ঘ দুই দশক পর গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেছে বিএনপি সরকার। দেশের অর্থনীতি যখন এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—বিশেষ করে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের নানা নীতিগত স্থবিরতা, দারিদ্র্য বৃদ্ধি, বিনিয়োগে খরা, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে জনজীবন বিপর্যস্ত—ঠিক তখনই এই বাজেট পেশ করা হলো।

সংকটের এই মুহূর্তে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট জনমনে কিছুটা হলেও আশার সঞ্চার করেছে। বিশেষ করে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং বেসরকারি খাতের টেকসই উন্নয়নে বাজেটে কিছু সুনির্দিষ্ট ও বৈপ্লবিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

​যেকোনো অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণের প্রথম শর্ত হলো সমস্যার সঠিক উৎস চিহ্নিত করা। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেটে বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের কারণগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরেছেন। একই সাথে সংকট থেকে উত্তরণের জন্য যে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী। তিনি সঠিকভাবেই অনুধাবন করেছেন যে, ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরায় সচল করতে হলে বেসরকারি খাতকে পুনরুজ্জীবিত করার কোনো বিকল্প নেই। বহুমুখী সমস্যায় জর্জরিত বেসরকারি খাতই যে অর্থনৈতিক ঘুরে দাঁড়ানোর মূল চাবিকাঠি, তা এই বাজেটে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

পরিকল্পিত শিল্পায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং প্রযুক্তিভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসারের মাধ্যমে তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা এবং নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি করা এই বাজেটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
​নিয়মনীতি ও আইনি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার মাধ্যমে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রতা দূর করে একটি স্বচ্ছ, সহজ ও সাশ্রয়ী ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী। ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পুঁজিবাজারের প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করার লক্ষ্য রয়েছে।

​সামগ্রিকভাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে ব্যবসা ও বিনিয়োগ সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করা যায়। উৎসে করকে চূড়ান্ত অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করায় ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের একটি বড় দাবি পূরণ হয়েছে।

এছাড়া শিল্পের কাঁচামালে উৎসে কর ৪ শতাংশে হ্রাস, ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে উৎসে কর ০.৫ শতাংশ করা, আগামী ৫ বছরের কর কাঠামো আগাম ঘোষণা এবং স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক যানবাহন (EV) খাতে করছাড়ের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

ভ্যাটের হার না বাড়িয়ে করের পরিধি সম্প্রসারণ এবং ত্রৈমাসিক অনলাইন ভ্যাট রিটার্নের বিধান একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় সিএমএসএমই (CMSME) খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ৫০ লাখ টাকা ও নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের জন্য ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার করমুক্ত রাখা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।

পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ই-লোন (E-Loan) চালুর সিদ্ধান্ত প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের উজ্জীবিত করবে।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ফ্ল্যাট রেটে টার্নওভার কর ও আলাদা ভ্যাট রিটার্ন ফরম কর ব্যবস্থাপনাকে অনেক সহজতর করবে।