বাকস্বাধীনতা বনাম অসভ্যতা: আমাদের বিবেক ও রাষ্ট্র মেরামতের চ্যালেঞ্জ
- আপডেটের সময়: ০৩:১৬:৩১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬
- / 471
ফাহিম মাহমুদ:
দীর্ঘ এক বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশ আজ এক নতুন সূর্যোদয়ের মুখোমুখি। গত ৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা যে রাষ্ট্র মেরামতের স্বপ্ন দেখছি, তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো বাকস্বাধীনতা। বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘ দেড় দশক গণতন্ত্র, ভোটাধিকার এবং নিজের মতামত প্রকাশের অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। আজ যখন সেই অবরুদ্ধ বাকস্বাধীনতা অবারিত হয়েছে, তখন আমাদের নাগরিক দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা কয়েক গুণ বেড়েছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, ৫ই আগস্ট পরবর্তী সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে রাজপথের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মগুলোতে আমরা যা দেখছি, তা কি প্রকৃত বাকস্বাধীনতা নাকি চরম এক সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়?
একটি সমাজের মানসিক সুস্থতা এবং অগ্রগতির মাপকাঠি হলো ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা এবং একে অপরের প্রতি আচরণ। কিন্তু বর্তমানে ফেসবুক বা অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করলেই দেখা যায় হ্যারাসমেন্ট বা হেনস্তার এক অসুস্থ মহোৎসব। আপনার রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত মতের সঙ্গে কারো সামান্য অমিল থাকলেই তাকে কুরুচিপূর্ণ ভাষায় আক্রমণ করা হচ্ছে। এই কদর্য সংস্কৃতির সবচেয়ে ভয়ংকর ও বীভৎস রূপটি দেখা যাচ্ছে নারীদের ওপর সাইবার আক্রমণের ক্ষেত্রে।
বর্তমানে ডিজিটাল মাধ্যমে নারীদের যেভাবে টার্গেট করা হচ্ছে, তাকে কোনোভাবেই ‘মতপ্রকাশ’ বলা যায় না; এটি স্পষ্টতই ‘ডিজিটাল সন্ত্রাস’। একজন নারী যখনই তাঁর কোনো স্বতন্ত্র মত বা আদর্শ প্রকাশ করেন, তখনই একদল মানুষ তাঁর অবয়ব, চরিত্র এবং ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে চরম নোংরা ও কুরুচিপূর্ণ ভাষায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই আক্রমণগুলো কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং এটি পরিকল্পিতভাবে নারীর কণ্ঠ রোধ করার একটি মাধ্যম। কোনো সভ্য সমাজে বা রাষ্ট্রে একজন নারীর আত্মসম্মান নিয়ে এভাবে প্রকাশ্যে ছিনিমিনি খেলা কখনোই বাকস্বাধীনতা হতে পারে না। এই অসভ্যতা যদি এখনই রুখে দেওয়া না যায়, তবে ভবিষ্যতে কোনো অভিভাবকই তাঁর সন্তানকে রাজনীতি বা এমন কোনো সাহসী পেশায় আসতে দেবেন না যেখানে জনসম্মুখে কথা বলতে হয়। নারীদের এভাবে কোণঠাসা করার অর্থ হলো—আমরা একটি জাতিকে পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছি।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, বিভিন্ন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে প্রতিবাদের নামে এখন অশালীন শব্দ ও কুরুচিপূর্ণ স্লোগান ব্যবহার করা হচ্ছে। আমাদের বুঝতে হবে, প্রতিবাদ কখনো নোংরা ভাষায় হতে পারে না; প্রতিবাদ হওয়া উচিত যুক্তিতে এবং উন্নত আদর্শে। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন আমরা একটি আধুনিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখছি, তখন ভাষার এই চরম দুর্দশা অত্যন্ত লজ্জাজনক। আমরা আজ যা করছি বা বলছি, তা আগামীদিনের ইতিহাস হয়ে থাকবে। প্রশ্ন জাগে, আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কী শিক্ষা রেখে যাচ্ছি? আমাদের উত্তরসূরিরা কি এই কদর্য ভাষা আর ঘৃণার সংস্কৃতিকেই আমাদের উত্তরাধিকার হিসেবে গ্রহণ করবে?
আমরা কথায় কথায় নিজেদের ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের বড়াই করি। অথচ আমাদের প্রাত্যহিক ব্যবহারে সেই শিক্ষার প্রতিফলন সামান্যই। আমাদের রাসুল (সা.)-এর জীবনের দিকে তাকালে আমরা এক অনন্য ধৈর্য ও শিষ্টাচারের আদর্শ দেখতে পাই। মক্কায় কাফেররা যখন তাঁর ওপর সীমাহীন অত্যাচার করেছে, তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালি দিয়েছে, তিনি কি কখনো প্রতিউত্তরে অশালীন শব্দ ব্যবহার করেছিলেন? সহিহ বুখারির (হাদিস নং ৬০৩১) বর্ণনা অনুযায়ী, মহানবী (সা.) কখনো কাউকে গালমন্দ করতেন না এবং অশালীন কথা বলতেন না। রাসুল (সা.)-এর এই অনুপম আদর্শ আমাদের শেখায় ভিন্নমতের প্রতি সহনশীল হতে। অথচ আজ আমরা ইন্টারনেটে আগুনের লেলিহান শিখার মতো ঘৃণা ছড়িয়ে দিচ্ছি। গালিগালাজ আর চরিত্রহননের এই প্রবণতা বাকস্বাধীনতা নয়, বরং এটি অন্যের অধিকার হরণের নামান্তর।
এই সংকট নিরসনে রাষ্ট্র ও সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। যারা স্মার্টফোন বা রাজনৈতিক মঞ্চের আড়ালে বসে অন্যকে হেনস্তা করছে, বিশেষ করে নারীদের ওপর সাইবার আক্রমণ চালাচ্ছে, তাদের প্রচলিত আইন যেমন—সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোর আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আইন প্রয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে এই কড়া বার্তা দিতে হবে যে, ভার্চুয়াল জগত কোনো আইনহীন মগের মুল্লুক নয়।
পরিশেষে বলতে চাই, ৫ই আগস্টের বিজয় মানে কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং আমাদের রুচি ও মানসিকতার পরিবর্তন। আমরা যদি ‘কী বলতে হবে’ এবং ‘কীভাবে বলতে হবে’—এই কাণ্ডজ্ঞানটুকু হারিয়ে ফেলি, তবে আমাদের সব ত্যাগ ও অর্জন ম্লান হয়ে যাবে। আসুন, আমরা প্রতিবাদ করতে শিখি, কিন্তু গালি দিতে নয়। আমরা সমালোচনা করি, কিন্তু কাউকে মানসিকভাবে হেনস্তা না করে। একটি মার্জিত ও সুশৃঙ্খল সমাজ গড়ার দায়িত্ব আমাদের প্রত্যেকের। নিজের ঘর এবং নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল থেকেই এই পরিবর্তনের সূচনা হোক।
লেখক: শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অফ দ্য ওয়েস্ট অফ ইংল্যান্ড (UWE), যুক্তরাজ্য।




















