যাদের কোনো ঠিকানা নেই, জলবায়ু সংকট তাদের ফেলবে কোথায়?

  • আপডেটের সময়: ০৮:৪১:৩৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
  • / 46

​মাহিন আলম আম্মান:

​জমিতে যাদের এক ইঞ্চি জায়গাও নিজের নেই, তাদের কাছে ঝড়, বন্যা কিংবা নদীভাঙনের মানে কী? এই প্রশ্নটা বুকে নিয়েই পৌঁছেছিলাম বরিশালের লাহারহাটে—নদীর বুকে ভেসে থাকা এক বিচ্ছিন্ন জনপদে।

​সেখানে প্রায় ১২৮টি মান্তা পরিবারের বসত। এক চিলতে কাঠের নৌকাই তাদের ঘর, আর নদীর ঢেউয়ের দোলাই ঘুমপাড়ানি গান। নৌকাতেই জন্ম, শৈশব, সংসার আর বেঁচে থাকার নিত্য লড়াই। ডাঙার মানুষের কাছে নদী হয়তো এক মনোরম দৃশ্য, গোধূলির আলোয় বাঁধানো কোনো ফ্রেম। কিন্তু এই মানুষগুলোর কাছে নদীই তাদের ঘর, হাটবাজার আর আহারের একমাত্র ঠিকানা। ভোরে নদীতে জাল ফেলে যা মেলে, তা দিয়েই নির্ধারণ হয় দিনের চালচিত্র। জালে মাছ না উঠলে চুলায় আগুন জ্বলে না; সন্তানদের বুকে জড়িয়ে অভুক্ত রাত পার করতে হয়।

​নৌকার সংকীর্ণ খোলে গুটিসুটি মেরে বসে নারীরা শোনালেন তাঁদের যাপিত জীবনের গল্প। কথাগুলো যেন নদীর স্রোতের মতোই বিষাদময় ও ভারী। খুব কম বয়সে বিয়ে, কৈশোরেই মাতৃত্বের বোঝা, পুষ্টিহীনতা আর চিকিৎসাহীন অনিশ্চয়তাই তাঁদের নিত্যসঙ্গী। কথায় কথায় ফিরে আসছিল স্কুলের চৌকাঠ না পেরোনোর আক্ষেপ। তবু সেই নড়বড়ে নৌকার পাটাতনে বসে তাঁরা বুকভরা স্বপ্ন আঁকেন—যে কষ্টের চক্রে তাঁদের জীবন বন্দি, সন্তানরা যেন কোনোভাবেই সেই অন্ধকারে না জড়ায়।

​মান্তা পল্লীর এই বাস্তবতায় একটি নির্মম সত্য স্পষ্ট: এই মানুষগুলোর পিছু হটার কোনো পথ নেই। কৃষকের ফসলের ক্ষতি হলে তিনি অন্য কাজে শ্রম বেচতে পারেন, দিনমজুর কাজের খোঁজে পাড়ি জমান শহরে। কিন্তু যার একমাত্র পুঁজি নদী আর পেশা কেবলই মাছ ধরা, নদী যদি রূপ বদলায়, সে দাঁড়াবে কোথায়?

​জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম কুঠার আঘাত হানছে ঠিক এই নাজুক বিন্দুতেই। বরিশাল অঞ্চল বরাবরই ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও প্রতিকূল আবহাওয়ার অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। ঝড় ঘনিয়ে এলে ডাঙার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যেতে পারে, কিন্তু নৌকাবাসীর আশ্রয় তো ওই কাঁপতে থাকা কাঠের খোলটিই। উত্তাল ঢেউয়ে নৌকা ভাঙলে তাঁদের বসতভিটা, জাল আর উপার্জনের শেষ সম্বল, সব এক নিমেষে তলিয়ে যায়।

​এর ওপর নদীর তাপমাত্রা, পানির লবণাক্ততা ও প্রবাহ বদলে যাওয়ায় মাছের প্রাপ্যতা দ্রুত কমছে। জাল খালি ফেরার দিন যত বাড়ছে, এই পরিবারগুলোর আয়ের পথ ততই শুকিয়ে আসছে। খাবারের টানাটানি বাড়লে তার সরাসরি আঘাত গিয়ে পড়ে মা ও শিশুদের ওপর, যারা আগে থেকেই তীব্র পুষ্টিহীনতার শিকার। পরিবারকে ভারমুক্ত করতে কন্যাশিশুকে দ্রুত বিয়ে দেওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে। এভাবে জলবায়ু সংকট নিঃশব্দে একেকটি শিশুর শৈশব, সম্ভাবনা আর শিক্ষার দরজাও বন্ধ করে দিচ্ছে।

​সবচেয়ে মর্মান্তিক সত্য হলো, বৈশ্বিক এই জলবায়ু সংকটে এই মানুষগুলোর দায় শূন্যের কোঠায়। তাঁদের কোনো কলকারখানা নেই, দামি গাড়ি নেই, নেই বিদ্যুৎ কিংবা জ্বালানির অপচয়। তবু সংকটের প্রথম এবং সবচেয়ে তীব্র আঘাতটি আছড়ে পড়ে তাঁদের ভাসমান নৌকার গায়েই।

​নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আরও একটি প্রশ্ন মনে দাগ কাটে: নীতিনির্ধারকদের জলবায়ু পরিকল্পনায় এই ঠিকানাহীন মানুষগুলো কি আদৌ কোনো জায়গা পায়? স্থায়ী ঠিকানা বা জমির দলিল না থাকায় সরকারি-বেসরকারি সহায়তার তালিকায় তাঁদের নাম তোলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অথচ জলবায়ু ন্যায়বিচারের আলোচনায় এই ভাসমান মানুষদের সবার আগে বিবেচনায় আনা দরকার, নইলে তথ্যের ভিড়ে তাঁরা চিরতরে অদৃশ্য হয়ে যাবেন।

​এই বাস্তবতা বদলাতে হলে এখনই কিছু সুনির্দিষ্ট উদ্যোগের সঙ্গে সংযোগ ঘটানো জরুরি। সবার আগে প্রয়োজন ভাসমান এই জনগোষ্ঠীর জন্য উপযোগী বিশেষ ঝড়-সতর্কবার্তা, উত্তাল ঢেউয়ে নৌকা বাঁধার সুরক্ষিত ব্যবস্থা এবং তাঁদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থলের বন্দোবস্ত করা। একই সাথে শুধু নদী আর মাছের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টি এবং নৌকায় বেড়ে ওঠা শিশুদের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। কারণ জলবায়ুর বিরূপ ধাক্কা সামলাতে সবচেয়ে বেশি সুরক্ষা দরকার তাঁদেরই, যাদের ফিরে তাকানোর মতো কোনো কূল নেই।

​মান্তাদের ঠিকানা বদলায় স্রোতের টানে; জীবন বাঁধা দাঁড় আর পালের দোলায়। তাই তাঁদের কাছে পৌঁছানো হয়তো সহজ নয়। তবে এই সফর আমাকে স্পষ্ট শিখিয়েছে জলবায়ুর আসল লড়াইটা শুরু হয় তাঁদের কথা শোনার মধ্য দিয়ে, যাদের কণ্ঠস্বর মূলধারায় কখনোই পৌঁছায় না। নদী তার আপন নিয়মেই বয়ে চলবে; কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, নদী যাদের একমাত্র ভিটা, সেই ভাসমান মানুষগুলোর পায়ের নিচেও অন্তত একটি নিরাপদ তীরের নিশ্চয়তা তৈরি করা।

ট্যাগ :

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন


যাদের কোনো ঠিকানা নেই, জলবায়ু সংকট তাদের ফেলবে কোথায়?

আপডেটের সময়: ০৮:৪১:৩৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

​মাহিন আলম আম্মান:

​জমিতে যাদের এক ইঞ্চি জায়গাও নিজের নেই, তাদের কাছে ঝড়, বন্যা কিংবা নদীভাঙনের মানে কী? এই প্রশ্নটা বুকে নিয়েই পৌঁছেছিলাম বরিশালের লাহারহাটে—নদীর বুকে ভেসে থাকা এক বিচ্ছিন্ন জনপদে।

​সেখানে প্রায় ১২৮টি মান্তা পরিবারের বসত। এক চিলতে কাঠের নৌকাই তাদের ঘর, আর নদীর ঢেউয়ের দোলাই ঘুমপাড়ানি গান। নৌকাতেই জন্ম, শৈশব, সংসার আর বেঁচে থাকার নিত্য লড়াই। ডাঙার মানুষের কাছে নদী হয়তো এক মনোরম দৃশ্য, গোধূলির আলোয় বাঁধানো কোনো ফ্রেম। কিন্তু এই মানুষগুলোর কাছে নদীই তাদের ঘর, হাটবাজার আর আহারের একমাত্র ঠিকানা। ভোরে নদীতে জাল ফেলে যা মেলে, তা দিয়েই নির্ধারণ হয় দিনের চালচিত্র। জালে মাছ না উঠলে চুলায় আগুন জ্বলে না; সন্তানদের বুকে জড়িয়ে অভুক্ত রাত পার করতে হয়।

​নৌকার সংকীর্ণ খোলে গুটিসুটি মেরে বসে নারীরা শোনালেন তাঁদের যাপিত জীবনের গল্প। কথাগুলো যেন নদীর স্রোতের মতোই বিষাদময় ও ভারী। খুব কম বয়সে বিয়ে, কৈশোরেই মাতৃত্বের বোঝা, পুষ্টিহীনতা আর চিকিৎসাহীন অনিশ্চয়তাই তাঁদের নিত্যসঙ্গী। কথায় কথায় ফিরে আসছিল স্কুলের চৌকাঠ না পেরোনোর আক্ষেপ। তবু সেই নড়বড়ে নৌকার পাটাতনে বসে তাঁরা বুকভরা স্বপ্ন আঁকেন—যে কষ্টের চক্রে তাঁদের জীবন বন্দি, সন্তানরা যেন কোনোভাবেই সেই অন্ধকারে না জড়ায়।

​মান্তা পল্লীর এই বাস্তবতায় একটি নির্মম সত্য স্পষ্ট: এই মানুষগুলোর পিছু হটার কোনো পথ নেই। কৃষকের ফসলের ক্ষতি হলে তিনি অন্য কাজে শ্রম বেচতে পারেন, দিনমজুর কাজের খোঁজে পাড়ি জমান শহরে। কিন্তু যার একমাত্র পুঁজি নদী আর পেশা কেবলই মাছ ধরা, নদী যদি রূপ বদলায়, সে দাঁড়াবে কোথায়?

​জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম কুঠার আঘাত হানছে ঠিক এই নাজুক বিন্দুতেই। বরিশাল অঞ্চল বরাবরই ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও প্রতিকূল আবহাওয়ার অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। ঝড় ঘনিয়ে এলে ডাঙার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যেতে পারে, কিন্তু নৌকাবাসীর আশ্রয় তো ওই কাঁপতে থাকা কাঠের খোলটিই। উত্তাল ঢেউয়ে নৌকা ভাঙলে তাঁদের বসতভিটা, জাল আর উপার্জনের শেষ সম্বল, সব এক নিমেষে তলিয়ে যায়।

​এর ওপর নদীর তাপমাত্রা, পানির লবণাক্ততা ও প্রবাহ বদলে যাওয়ায় মাছের প্রাপ্যতা দ্রুত কমছে। জাল খালি ফেরার দিন যত বাড়ছে, এই পরিবারগুলোর আয়ের পথ ততই শুকিয়ে আসছে। খাবারের টানাটানি বাড়লে তার সরাসরি আঘাত গিয়ে পড়ে মা ও শিশুদের ওপর, যারা আগে থেকেই তীব্র পুষ্টিহীনতার শিকার। পরিবারকে ভারমুক্ত করতে কন্যাশিশুকে দ্রুত বিয়ে দেওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে। এভাবে জলবায়ু সংকট নিঃশব্দে একেকটি শিশুর শৈশব, সম্ভাবনা আর শিক্ষার দরজাও বন্ধ করে দিচ্ছে।

​সবচেয়ে মর্মান্তিক সত্য হলো, বৈশ্বিক এই জলবায়ু সংকটে এই মানুষগুলোর দায় শূন্যের কোঠায়। তাঁদের কোনো কলকারখানা নেই, দামি গাড়ি নেই, নেই বিদ্যুৎ কিংবা জ্বালানির অপচয়। তবু সংকটের প্রথম এবং সবচেয়ে তীব্র আঘাতটি আছড়ে পড়ে তাঁদের ভাসমান নৌকার গায়েই।

​নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আরও একটি প্রশ্ন মনে দাগ কাটে: নীতিনির্ধারকদের জলবায়ু পরিকল্পনায় এই ঠিকানাহীন মানুষগুলো কি আদৌ কোনো জায়গা পায়? স্থায়ী ঠিকানা বা জমির দলিল না থাকায় সরকারি-বেসরকারি সহায়তার তালিকায় তাঁদের নাম তোলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অথচ জলবায়ু ন্যায়বিচারের আলোচনায় এই ভাসমান মানুষদের সবার আগে বিবেচনায় আনা দরকার, নইলে তথ্যের ভিড়ে তাঁরা চিরতরে অদৃশ্য হয়ে যাবেন।

​এই বাস্তবতা বদলাতে হলে এখনই কিছু সুনির্দিষ্ট উদ্যোগের সঙ্গে সংযোগ ঘটানো জরুরি। সবার আগে প্রয়োজন ভাসমান এই জনগোষ্ঠীর জন্য উপযোগী বিশেষ ঝড়-সতর্কবার্তা, উত্তাল ঢেউয়ে নৌকা বাঁধার সুরক্ষিত ব্যবস্থা এবং তাঁদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থলের বন্দোবস্ত করা। একই সাথে শুধু নদী আর মাছের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টি এবং নৌকায় বেড়ে ওঠা শিশুদের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। কারণ জলবায়ুর বিরূপ ধাক্কা সামলাতে সবচেয়ে বেশি সুরক্ষা দরকার তাঁদেরই, যাদের ফিরে তাকানোর মতো কোনো কূল নেই।

​মান্তাদের ঠিকানা বদলায় স্রোতের টানে; জীবন বাঁধা দাঁড় আর পালের দোলায়। তাই তাঁদের কাছে পৌঁছানো হয়তো সহজ নয়। তবে এই সফর আমাকে স্পষ্ট শিখিয়েছে জলবায়ুর আসল লড়াইটা শুরু হয় তাঁদের কথা শোনার মধ্য দিয়ে, যাদের কণ্ঠস্বর মূলধারায় কখনোই পৌঁছায় না। নদী তার আপন নিয়মেই বয়ে চলবে; কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, নদী যাদের একমাত্র ভিটা, সেই ভাসমান মানুষগুলোর পায়ের নিচেও অন্তত একটি নিরাপদ তীরের নিশ্চয়তা তৈরি করা।