ফাস ফাইন্যান্সের ৯৯.৯৯ শতাংশ ঋণ খেলাপি, জামানতের কাগজপত্র নেই

  • আপডেটের সময়: ১১:৩৮:২৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 76

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ফাস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড গভীর আর্থিক সংকটে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫ সালের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, বিতরণ করা মোট ঋণ ও বিনিয়োগের ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশই বর্তমানে খেলাপি। বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের বিপরীতে জামানত হিসেবে দেখানো সম্পদের বেশির ভাগেরই মূল কাগজপত্র নেই।

নিরীক্ষক কাজী আহমেদ মনোয়ারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নমুনাভিত্তিক যাচাইয়ে অধিকাংশ ঋণের নথিতে মূল দলিল, নামজারি ও সরকারি খাজনা পরিশোধের রসিদের ঘাটতি পাওয়া গেছে। এতে জামানত হিসেবে দেখানো সম্পদের অস্তিত্ব নিয়েই সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ফাস ফাইন্যান্সে তহবিল তছরুপ ও জালিয়াতিপূর্ণ ঋণ বিতরণের ঘটনা শনাক্ত হয়। এর পর ২০১৮ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি সীমিত পরিসরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব কারণে প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক আর্থিক অবস্থার ব্যাপক অবনতি হয়েছে। তহবিল তছরুপের কারণে আমানতকারীদের সময়মতো অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা হারিয়েছে কোম্পানিটি। পাশাপাশি নতুন সম্পদ তৈরি ও আমানত সংগ্রহও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

নিরীক্ষক আরও বলেছেন, কোম্পানিটির দুর্বল আর্থিক অবস্থার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। আর্থিক অবস্থা গভীরভাবে মূল্যায়নের পর বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি কোম্পানিটির অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এখনো কোম্পানিটির হাতে পৌঁছায়নি। তবে নিরীক্ষকের সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ হলো, নিকট ভবিষ্যতে কোম্পানিটির স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।

ফাস ফাইন্যান্সের মূলধন পরিস্থিতিও অত্যন্ত নাজুক। ২০২৫ সালের শেষে কোম্পানিটির মূলধন পর্যাপ্ততার হার (সিএআর) দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৩১৬ দশমিক ৮৭ শতাংশ। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় হার ন্যূনতম ১০ শতাংশ। একই সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩১ টাকা ৭১ পয়সা। শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যও (এনএভি) অস্বাভাবিকভাবে কমে ঋণাত্মক ১৪৪ টাকা ৭৯ পয়সায় নেমে এসেছে। এর আগে বলা হয়েছে, কোম্পানির মোট ঋণ ও বিনিয়োগের ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশই খেলাপি।

বিতরণ করা ঋণের বিপরীতে জামানতের মূল্য বিবেচনায় নিয়ে কোম্পানি ৮৭৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকা সঞ্চিত প্রভিশন হিসাব করেছে। তবে নমুনাভিত্তিক যাচাইয়ে অধিকাংশ ঋণ নথিতে মূল দলিল, নামজারি ও সরকারি খাজনা পরিশোধের রসিদের যথেষ্ট ঘাটতি পেয়েছেন নিরীক্ষক।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কোম্পানিটির সঞ্চিত মোট লোকসান দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩৪১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। এ সময় কোম্পানিটির মোট দায় মোট সম্পদের চেয়ে ২ হাজার ১৫৮ কোটি ৪২ লাখ টাকা বেশি ছিল। পাশাপাশি পরিচালন নগদ প্রবাহ ছিল ঋণাত্মক ১৫ কোটি ৩ লাখ টাকা, যা তীব্র নগদ অর্থসংকটের ইঙ্গিত দেয়।

উদ্বেগের বিষয় হলো, এসএলআর হিসেবে কোম্পানি যে ২৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা সংরক্ষণের কথা জানিয়েছে, তার মধ্যে ১৪ কোটির বেশি টাকা ছিল ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, প্রিমিয়ার লিজিং ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে রাখা স্থায়ী আমানত। নিরীক্ষকের মতে, এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থা দুর্বল হওয়ায় ওই অর্থ আদায় নিয়ে গভীর সন্দেহ রয়েছে।

এর পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ফাস ফাইন্যান্সের রাখা প্রায় ১৪৫ কোটি টাকার স্থায়ী আমানতের অস্তিত্বও নিরীক্ষক স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেননি।

অন্য ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও এজেন্টদের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের মধ্যে ১৮৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকার বিপরীতে কোম্পানি কোনো ঋণ বিবরণী দিতে পারেনি। পাশাপাশি রাজস্ব খাতেও অনিয়মের চিত্র পাওয়া গেছে। উৎসে কর, ভ্যাট ও আবগারি শুল্ক হিসেবে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার জন্য ৯৮ কোটি ৯৮ লাখ টাকা পরিশোধযোগ্য দেখালেও কোম্পানিটি তা যথাসময়ে জমা দেয়নি।

সূত্র: আগামীর সময়

ট্যাগ :

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন


ফাস ফাইন্যান্সের ৯৯.৯৯ শতাংশ ঋণ খেলাপি, জামানতের কাগজপত্র নেই

আপডেটের সময়: ১১:৩৮:২৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ফাস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড গভীর আর্থিক সংকটে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫ সালের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, বিতরণ করা মোট ঋণ ও বিনিয়োগের ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশই বর্তমানে খেলাপি। বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের বিপরীতে জামানত হিসেবে দেখানো সম্পদের বেশির ভাগেরই মূল কাগজপত্র নেই।

নিরীক্ষক কাজী আহমেদ মনোয়ারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নমুনাভিত্তিক যাচাইয়ে অধিকাংশ ঋণের নথিতে মূল দলিল, নামজারি ও সরকারি খাজনা পরিশোধের রসিদের ঘাটতি পাওয়া গেছে। এতে জামানত হিসেবে দেখানো সম্পদের অস্তিত্ব নিয়েই সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ফাস ফাইন্যান্সে তহবিল তছরুপ ও জালিয়াতিপূর্ণ ঋণ বিতরণের ঘটনা শনাক্ত হয়। এর পর ২০১৮ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি সীমিত পরিসরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব কারণে প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক আর্থিক অবস্থার ব্যাপক অবনতি হয়েছে। তহবিল তছরুপের কারণে আমানতকারীদের সময়মতো অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা হারিয়েছে কোম্পানিটি। পাশাপাশি নতুন সম্পদ তৈরি ও আমানত সংগ্রহও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

নিরীক্ষক আরও বলেছেন, কোম্পানিটির দুর্বল আর্থিক অবস্থার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। আর্থিক অবস্থা গভীরভাবে মূল্যায়নের পর বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি কোম্পানিটির অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এখনো কোম্পানিটির হাতে পৌঁছায়নি। তবে নিরীক্ষকের সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ হলো, নিকট ভবিষ্যতে কোম্পানিটির স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।

ফাস ফাইন্যান্সের মূলধন পরিস্থিতিও অত্যন্ত নাজুক। ২০২৫ সালের শেষে কোম্পানিটির মূলধন পর্যাপ্ততার হার (সিএআর) দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৩১৬ দশমিক ৮৭ শতাংশ। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় হার ন্যূনতম ১০ শতাংশ। একই সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩১ টাকা ৭১ পয়সা। শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যও (এনএভি) অস্বাভাবিকভাবে কমে ঋণাত্মক ১৪৪ টাকা ৭৯ পয়সায় নেমে এসেছে। এর আগে বলা হয়েছে, কোম্পানির মোট ঋণ ও বিনিয়োগের ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশই খেলাপি।

বিতরণ করা ঋণের বিপরীতে জামানতের মূল্য বিবেচনায় নিয়ে কোম্পানি ৮৭৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকা সঞ্চিত প্রভিশন হিসাব করেছে। তবে নমুনাভিত্তিক যাচাইয়ে অধিকাংশ ঋণ নথিতে মূল দলিল, নামজারি ও সরকারি খাজনা পরিশোধের রসিদের যথেষ্ট ঘাটতি পেয়েছেন নিরীক্ষক।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কোম্পানিটির সঞ্চিত মোট লোকসান দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩৪১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। এ সময় কোম্পানিটির মোট দায় মোট সম্পদের চেয়ে ২ হাজার ১৫৮ কোটি ৪২ লাখ টাকা বেশি ছিল। পাশাপাশি পরিচালন নগদ প্রবাহ ছিল ঋণাত্মক ১৫ কোটি ৩ লাখ টাকা, যা তীব্র নগদ অর্থসংকটের ইঙ্গিত দেয়।

উদ্বেগের বিষয় হলো, এসএলআর হিসেবে কোম্পানি যে ২৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা সংরক্ষণের কথা জানিয়েছে, তার মধ্যে ১৪ কোটির বেশি টাকা ছিল ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, প্রিমিয়ার লিজিং ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে রাখা স্থায়ী আমানত। নিরীক্ষকের মতে, এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থা দুর্বল হওয়ায় ওই অর্থ আদায় নিয়ে গভীর সন্দেহ রয়েছে।

এর পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ফাস ফাইন্যান্সের রাখা প্রায় ১৪৫ কোটি টাকার স্থায়ী আমানতের অস্তিত্বও নিরীক্ষক স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেননি।

অন্য ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও এজেন্টদের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের মধ্যে ১৮৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকার বিপরীতে কোম্পানি কোনো ঋণ বিবরণী দিতে পারেনি। পাশাপাশি রাজস্ব খাতেও অনিয়মের চিত্র পাওয়া গেছে। উৎসে কর, ভ্যাট ও আবগারি শুল্ক হিসেবে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার জন্য ৯৮ কোটি ৯৮ লাখ টাকা পরিশোধযোগ্য দেখালেও কোম্পানিটি তা যথাসময়ে জমা দেয়নি।

সূত্র: আগামীর সময়