গ্রিড আধুনিকায়ন ছাড়া সোলার লক্ষ্যমাত্রা: বিদ্যুৎ খাতে নতুন ব্ল্যাকআউটের ঝুঁকি?

  • আপডেটের সময়: ০৯:১০:৩০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
  • / 59

বেলাল হোসেন রাজু:

দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার ঘটাতে সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রাংশের ওপর থেকে সব ধরনের আমদানি শুল্ক ও রেগুলেটরি ডিউটি প্রত্যাহার করেছে সরকার। আগামী গ্রীষ্মের আগেই জাতীয় গ্রিডে জরুরি ভিত্তিতে ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্যও ঠিক করা হয়েছে। তবে বিদ্যুৎ অর্থনীতিবিদ, পরিবেশ আইনজীবী ও প্রকৌশলীদের মূল্যায়ন বলছে ভিন্ন কথা। জাতীয় সঞ্চালন গ্রিড আধুনিক না করে কেবল আমদানিনির্ভর মেগাওয়াট যুক্ত করার এই উদ্যোগ দেশের বিদ্যুৎ খাতকে উল্টো বড় ধরনের কাঠামোগত ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় গ্রিডকে ‘স্মার্ট’ ও নমনীয় না করে এবং ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (বিইএসএস) না বসিয়ে এই পরিবর্তনশীল বিদ্যুৎ গ্রিডে ঢোকানো বিপজ্জনক। এতে টেকনিক্যাল ব্ল্যাকআউটের ঝুঁকি তৈরি হবে। একই সঙ্গে এটি জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মেয়াদ দীর্ঘায়িত করার অজুহাত জোগাবে। সম্প্রতি বুয়েট কেন্দ্রীয় মাঠে অনুষ্ঠিত ‘দ্বিতীয় নবায়নযোগ্য শক্তি উৎসব ২০২৬’-এর নীতিনির্ধারণী অধিবেশনে এই কারিগরি ও নীতিগত সংকট স্পষ্টভাবে উঠে আসে। আসন্ন জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনের (কপ-৩১) আগে যা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থানের নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

চরাঞ্চলের মিনি-গ্রিডে ব্যাটারি সংকট ও ডিজেল নির্ভরতা

পরিসংখ্যানে সৌরবিদ্যুতের অংশ বাড়ানোর তোড়জোড় থাকলেও তৃণমূলের চিত্র পুরোপুরি উল্টো। ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) অর্থায়নে দেশের দুর্গম উপকূল ও চরাঞ্চলে স্থাপিত ৩০টির বেশি সোলার মিনি-গ্রিডের অর্ধেকের বেশি এখন অচল বা ধুঁকছে।

বুয়েট, বিআইডিএস এবং বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চরাঞ্চলের এসব মিনি-গ্রিড মূলত ‘সোলার-ডিজেল হাইব্রিড’ মডেলে তৈরি। ব্যাটারির আয়ু শেষ হয়ে যাওয়া এবং আধুনিক স্টোরেজ প্রযুক্তি না থাকায় রাতে বা মেঘলা দিনে জেনারেটর চালাতে হয়। আন্তর্জাতিক তথ্যানুযায়ী, এই মিনি-গ্রিডগুলোর মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৮ থেকে ১৫ শতাংশ আসে সরাসরি ডিজেল পুড়িয়ে। একই কারণে সৌরচালিত সেচ পাম্পগুলোও রাতে চলতে পারে না। ফলে বাধ্য হয়ে কৃষকদের ডিজেলচালিত শ্যালো ইঞ্জিন চালাতে হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জের যমুনা চরের কৃষক রহমত মিয়া (৪৫) মাঠের বাস্তবতা তুলে ধরে বলেন, “চরে বসানো সোলার প্যানেল দিনের রোদে ঠিকঠাক চললেও বিকেল গড়াতেই বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে যায়। ব্যাটারির মেয়াদ অনেক আগেই শেষ, কিন্তু নতুন ব্যাটারি বসানোর টাকা নাকি কোম্পানির নেই। সাধারণ গ্রিডের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ইউনিটপ্রতি ৩০ থেকে ৩৫ টাকা চড়া বিল দিয়েও রাতে আমাদের অন্ধকারে কাটাতে হয়। মেঘলা দিনেও একই দসা। দিনশেষে ফসল বাঁচাতে সেচের পাম্প চালানো আর রাতে বাতি জ্বালাতে সেই চড়া দামের ডিজেল পোড়ানোই আমাদের একমাত্র ভরসা।”

অলস ক্যাপাসিটি চার্জ ও গ্রিডের দুর্বলতা

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা আইইইএফএ-র তথ্যমতে, দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ। অথচ সঞ্চালন লাইন ও আধুনিক সংরক্ষণের অভাবে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ জনগণের কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে না। উল্টো কেন্দ্র অলস বসিয়ে রেখে প্রতি বছর সরকারকে ২০ থেকে ২৬ হাজার কোটি টাকার বেশি ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ গুনতে হচ্ছে।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি) ও গবেষকদের তথ্য বলছে, আমাদের জাতীয় গ্রিড এখনো সনাতন পদ্ধতিতে পরিচালিত। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) হিসাবে, গ্রিডে যুক্ত সৌরবিদ্যুৎ এখন মাত্র ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের মতো। রোদ ও মেঘের তারতম্যে সৌরবিদ্যুৎ হঠাৎ ওঠানামা করলে গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি ও ভোল্টেজের ভারসাম্য নষ্ট হয়। একযোগে ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ হঠাৎ গ্রিড থেকে ছিটকে গেলে দেশজুড়ে ব্ল্যাকআউট হতে পারে।

এই দুর্বলতাকেই কাজে লাগাচ্ছে জীবাশ্ম জ্বালানি লবি। গ্রিডের স্থায়িত্বের অজুহাতে বিদ্যুৎ বিভাগ তেল ও গ্যাসচালিত ব্যয়বহুল ‘পিকিং প্ল্যান্ট’গুলোকে ব্যাকআপ হিসেবে চালু রাখার পক্ষে যুক্তি দিচ্ছে। এতে সবুজ রূপান্তরের নামে পরিবেশ ধ্বংসের পাশাপাশি ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা স্থায়ী হচ্ছে।

তবে গ্রিডের নিরাপত্তা নিয়ে আশাবাদী পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি)। সংস্থাটির সংশ্লিষ্ট দপ্তর জানিয়েছে, পরিবর্তনশীল নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ নিরাপদে সঞ্চালনের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিকায়নের কাজ পুরোদমে চলছে। ফ্রিকোয়েন্সির ভারসাম্য রাখা, ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ এবং স্বয়ংক্রিয় সুরক্ষার জোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কারিগরি সমন্বয় সেরে অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে সুষ্ঠুভাবে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হবে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

গ্রিড যখন ধুঁকছে, তখন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বড় অঙ্কের বিদেশি ঋণ ও অবকাঠামোর আলোচনা সামনে এসেছে। সম্প্রতি টোকিওতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-জাপান শীর্ষ বৈঠকে ‘পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় ৫০ বিলিয়ন জাপানি ইয়েনের জরুরি ঋণ এবং জ্বালানি, অবকাঠামো ও আইসিটি খাতে প্রায় ৬.৩ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে নবায়নযোগ্য শক্তির পাশাপাশি এলএনজি অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ চাওয়া হয়।

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনায় বড় অঙ্কের ঋণ ও এলএনজিই প্রাধান্য পায়। অথচ জাতীয় গ্রিড আধুনিকায়ন ও দেশীয় ব্যাটারি প্রযুক্তির বিকাশ সবচেয়ে জরুরি। এগুলো বাদ দিয়ে আমদানি বাড়ালে তা দেশের কাঁধে ঋণের বোঝা বাড়াবে।

নীতিগত সমন্বয়হীনতা ও জলবায়ু ঋণের ঝুঁকি: শরীফ জামিল

ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়কারী এবং ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-র সদস্য সচিব শরীফ জামিল বলেন, “সঞ্চালন গ্রিডকে স্মার্ট করা, ব্যাটারি স্টোরেজ অবকাঠামো স্থাপন করা এবং সোলার সিস্টেম স্থাপন করার সিদ্ধান্ত একটি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনা জরুরি। বিচ্ছিন্নভাবে কোন একটি বিষয়ে এগিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জিত হবে না। বরং তা নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনাকে নষ্ট করে নোংরা কয়লা, গ্যাস আর তেলের প্ল্যান্টগুলোকে অনির্দিষ্টকালের জন্য টিকে থাকতে সহায়তা করতে পারে।”

আসন্ন কপ-৩১ সম্মেলন ও আন্তর্জাতিক ঋণ প্রসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, “বিদ্যুৎ বিভাগ নিজেদের দূর্বলতা উত্তরণ করে আন্তর্জাতিক তহবিল থেকে অর্থ আদায়ে কতটা সক্ষম তা দেখতে হবে। কপ-৩১ এ গিয়ে যদি স্মার্ট গ্রিড ও ব্যাটারির জন্য উন্নত বিশ্বের বাণিজ্যিক ঋণ নেওয়া হয়, তবে তা বাংলাদেশকে নতুন ‘ক্লাইমেট ডেট ট্র্যাপ’ বা জলবায়ু ঋণের ফাঁদে ফেলবে। দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক যেকোনো অর্থায়নেই হোক ঐতিহাসিক দূষণের ক্ষতিপূরণ হিসেবে উন্নত বিশ্বকে এই প্রযুক্তি ও অর্থ অনুদান হিসেবে দিতে বাধ্য করতে হবে; জাতীয় অব্যবস্থাপনার দায় কোনো অবস্থাতেই ঋণে রূপান্তর করা যাবে না।”

সিন্ডিকেটে আটকে আছে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ

সরকার যখন বৃহৎ আমদানিকারকদের জন্য শুল্ক ছাড় দিচ্ছে, তখন সাধারণ উদ্যোক্তা ও বাসাবাড়ির ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ (রুফটপ সোলার) বিতরণ কোম্পানিগুলোর জটিলতায় আটকে আছে। আইইইএফএ-র তথ্যমতে, দেশে ৩ থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট রুফটপ সোলারের সম্ভাবনা থাকলেও বিতরণ সংস্থাগুলোর অনাগ্রহে এর বাস্তবায়ন এখনো ১ হাজার মেগাওয়াটের নিচে।

বিতরণ সংস্থাগুলোর আয়ের মূল উৎস শিল্প ও বাণিজ্যিক গ্রাহক। গ্রাহক নিজে বিদ্যুৎ তৈরি করলে বিক্রি কমে যাবে—এই ভয়ে ডিপিডিসি, ডেসকো ও আরইবির মতো সংস্থাগুলো ‘গ্রিড সক্ষমতা নেই’ কিংবা ‘রিভার্স পাওয়ার ফ্লো’-এর অজুহাতে নেট-মিটারিংয়ের ফাইল আটকে রাখছে।

দরজায় কড়া নাড়ছে সোলার ই-বর্জ্যের সংকট

আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য শক্তি সংস্থার (আইরেনা) হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের পর থেকে দেশে প্রথম প্রজন্মের সোলার হোম সিস্টেম ও প্ল্যান্টগুলো থেকে কয়েক লাখ টন প্যানেল বর্জ্যে পরিণত হবে।

সৌর প্যানেলে ক্ষতিকর সিলিকন, ক্যাডমিয়াম ও সিসা থাকে। তবে এগুলো পুনর্ব্যবহার বা নিরাপদ অপসারণের কোনো জাতীয় নীতিমালা এখনো নেই। মেয়াদোত্তীর্ণ প্যানেলগুলো সাধারণ ভাঙারির দোকানে অনিরাপদভাবে ভেঙে কাচ আলাদা করা হচ্ছে। বাকি বিষাক্ত অংশ ফেলা হচ্ছে উন্মুক্ত জলাশয় বা মাটিতে। ফলে তথাকথিত পরিবেশবান্ধব রূপান্তর কৃষিজমি ও পানির জন্য মারাত্মক রাসায়নিক বিপর্যয় ডেকে আনছে।

আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে দেশীয় উদ্ভাবন ও গ্রিন জবসের তাগিদ: সাইদুর রহমান সিয়াম

জলবায়ু ন্যায়বিচার কর্মী এবং ব্রাইটার্স-এর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক সাইদুর রহমান সিয়াম বলেন, “নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে সরকারের এই উদ্যোগ একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সঞ্চালন সক্ষমতা, গ্রিড আধুনিকায়ন, জ্বালানি সংরক্ষণ বা স্টোরেজ অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সাশ্রয়ী স্টোরেজ প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।”

তিনি আরও বলেন, “সৌরবিদ্যুৎ খাতকে শুধু যন্ত্রাংশ আমদানিনির্ভর না রেখে দেশীয় উৎপাদন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরির দিকে এগিয়ে নিতে হবে। এ খাতে স্টার্টআপ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন, নীতিগত সহায়তা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারের পাশাপাশি তরুণদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান ও স্থায়ী ‘গ্রিন জবস’ তৈরি সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সৌর প্যানেলের জীবনচক্র শেষে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পুনর্ব্যবহারের কার্যকর নীতিমালা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে এই রূপান্তর পরিবেশগতভাবে টেকসই হয়।”

তিনি বলেন, “সামনে কপ-৩১-কে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের উচিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, উদ্ভাবন এবং ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তরের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা। নতুন ঋণের বোঝা না বাড়িয়ে উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে জলবায়ু ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে অনুদান, সহজলভ্য প্রযুক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা আদায়ের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। সঠিক নীতিগত সহায়তা, উদ্ভাবন এবং তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে সরকারের এই উদ্যোগ বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”

কপ-৩১-এর আগে নীতিগত জবাবদিহির ডাক

তুরস্কে অনুষ্ঠেয় ৩১তম জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনের (কপ-৩১) আগে বাংলাদেশের হাতে সময় কম। বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিলের ন্যায্য হিস্যা দাবি করার নৈতিক ভিত্তি তখনই তৈরি হবে, যখন দেশের অভ্যন্তরীণ নীতিতে জবাবদিহি ও সমন্বয় নিশ্চিত হবে।

কেবল শুল্ক ছাড়ের ওপর নির্ভর না করে সঞ্চালন গ্রিড আধুনিকায়ন, ব্যাটারি স্টোরেজ স্থাপন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালা প্রণয়নই এখন জ্বালানি নিরাপত্তা ও জলবায়ু ন্যায়ের পূর্বশর্ত। অন্যথায়, এই ‘সবুজ রূপান্তর’ দেশের বিদ্যুৎ খাতকে দীর্ঘমেয়াদে জীবাশ্ম সিন্ডিকেটের চাপ ও আন্তর্জাতিক ঋণের ফাঁদে আটকে ফেলবে।

ট্যাগ :

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন


গ্রিড আধুনিকায়ন ছাড়া সোলার লক্ষ্যমাত্রা: বিদ্যুৎ খাতে নতুন ব্ল্যাকআউটের ঝুঁকি?

আপডেটের সময়: ০৯:১০:৩০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

বেলাল হোসেন রাজু:

দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার ঘটাতে সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রাংশের ওপর থেকে সব ধরনের আমদানি শুল্ক ও রেগুলেটরি ডিউটি প্রত্যাহার করেছে সরকার। আগামী গ্রীষ্মের আগেই জাতীয় গ্রিডে জরুরি ভিত্তিতে ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্যও ঠিক করা হয়েছে। তবে বিদ্যুৎ অর্থনীতিবিদ, পরিবেশ আইনজীবী ও প্রকৌশলীদের মূল্যায়ন বলছে ভিন্ন কথা। জাতীয় সঞ্চালন গ্রিড আধুনিক না করে কেবল আমদানিনির্ভর মেগাওয়াট যুক্ত করার এই উদ্যোগ দেশের বিদ্যুৎ খাতকে উল্টো বড় ধরনের কাঠামোগত ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় গ্রিডকে ‘স্মার্ট’ ও নমনীয় না করে এবং ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (বিইএসএস) না বসিয়ে এই পরিবর্তনশীল বিদ্যুৎ গ্রিডে ঢোকানো বিপজ্জনক। এতে টেকনিক্যাল ব্ল্যাকআউটের ঝুঁকি তৈরি হবে। একই সঙ্গে এটি জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মেয়াদ দীর্ঘায়িত করার অজুহাত জোগাবে। সম্প্রতি বুয়েট কেন্দ্রীয় মাঠে অনুষ্ঠিত ‘দ্বিতীয় নবায়নযোগ্য শক্তি উৎসব ২০২৬’-এর নীতিনির্ধারণী অধিবেশনে এই কারিগরি ও নীতিগত সংকট স্পষ্টভাবে উঠে আসে। আসন্ন জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনের (কপ-৩১) আগে যা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থানের নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

চরাঞ্চলের মিনি-গ্রিডে ব্যাটারি সংকট ও ডিজেল নির্ভরতা

পরিসংখ্যানে সৌরবিদ্যুতের অংশ বাড়ানোর তোড়জোড় থাকলেও তৃণমূলের চিত্র পুরোপুরি উল্টো। ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) অর্থায়নে দেশের দুর্গম উপকূল ও চরাঞ্চলে স্থাপিত ৩০টির বেশি সোলার মিনি-গ্রিডের অর্ধেকের বেশি এখন অচল বা ধুঁকছে।

বুয়েট, বিআইডিএস এবং বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চরাঞ্চলের এসব মিনি-গ্রিড মূলত ‘সোলার-ডিজেল হাইব্রিড’ মডেলে তৈরি। ব্যাটারির আয়ু শেষ হয়ে যাওয়া এবং আধুনিক স্টোরেজ প্রযুক্তি না থাকায় রাতে বা মেঘলা দিনে জেনারেটর চালাতে হয়। আন্তর্জাতিক তথ্যানুযায়ী, এই মিনি-গ্রিডগুলোর মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৮ থেকে ১৫ শতাংশ আসে সরাসরি ডিজেল পুড়িয়ে। একই কারণে সৌরচালিত সেচ পাম্পগুলোও রাতে চলতে পারে না। ফলে বাধ্য হয়ে কৃষকদের ডিজেলচালিত শ্যালো ইঞ্জিন চালাতে হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জের যমুনা চরের কৃষক রহমত মিয়া (৪৫) মাঠের বাস্তবতা তুলে ধরে বলেন, “চরে বসানো সোলার প্যানেল দিনের রোদে ঠিকঠাক চললেও বিকেল গড়াতেই বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে যায়। ব্যাটারির মেয়াদ অনেক আগেই শেষ, কিন্তু নতুন ব্যাটারি বসানোর টাকা নাকি কোম্পানির নেই। সাধারণ গ্রিডের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ইউনিটপ্রতি ৩০ থেকে ৩৫ টাকা চড়া বিল দিয়েও রাতে আমাদের অন্ধকারে কাটাতে হয়। মেঘলা দিনেও একই দসা। দিনশেষে ফসল বাঁচাতে সেচের পাম্প চালানো আর রাতে বাতি জ্বালাতে সেই চড়া দামের ডিজেল পোড়ানোই আমাদের একমাত্র ভরসা।”

অলস ক্যাপাসিটি চার্জ ও গ্রিডের দুর্বলতা

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা আইইইএফএ-র তথ্যমতে, দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ। অথচ সঞ্চালন লাইন ও আধুনিক সংরক্ষণের অভাবে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ জনগণের কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে না। উল্টো কেন্দ্র অলস বসিয়ে রেখে প্রতি বছর সরকারকে ২০ থেকে ২৬ হাজার কোটি টাকার বেশি ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ গুনতে হচ্ছে।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি) ও গবেষকদের তথ্য বলছে, আমাদের জাতীয় গ্রিড এখনো সনাতন পদ্ধতিতে পরিচালিত। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) হিসাবে, গ্রিডে যুক্ত সৌরবিদ্যুৎ এখন মাত্র ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের মতো। রোদ ও মেঘের তারতম্যে সৌরবিদ্যুৎ হঠাৎ ওঠানামা করলে গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি ও ভোল্টেজের ভারসাম্য নষ্ট হয়। একযোগে ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ হঠাৎ গ্রিড থেকে ছিটকে গেলে দেশজুড়ে ব্ল্যাকআউট হতে পারে।

এই দুর্বলতাকেই কাজে লাগাচ্ছে জীবাশ্ম জ্বালানি লবি। গ্রিডের স্থায়িত্বের অজুহাতে বিদ্যুৎ বিভাগ তেল ও গ্যাসচালিত ব্যয়বহুল ‘পিকিং প্ল্যান্ট’গুলোকে ব্যাকআপ হিসেবে চালু রাখার পক্ষে যুক্তি দিচ্ছে। এতে সবুজ রূপান্তরের নামে পরিবেশ ধ্বংসের পাশাপাশি ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা স্থায়ী হচ্ছে।

তবে গ্রিডের নিরাপত্তা নিয়ে আশাবাদী পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি)। সংস্থাটির সংশ্লিষ্ট দপ্তর জানিয়েছে, পরিবর্তনশীল নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ নিরাপদে সঞ্চালনের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিকায়নের কাজ পুরোদমে চলছে। ফ্রিকোয়েন্সির ভারসাম্য রাখা, ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ এবং স্বয়ংক্রিয় সুরক্ষার জোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কারিগরি সমন্বয় সেরে অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে সুষ্ঠুভাবে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হবে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

গ্রিড যখন ধুঁকছে, তখন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বড় অঙ্কের বিদেশি ঋণ ও অবকাঠামোর আলোচনা সামনে এসেছে। সম্প্রতি টোকিওতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-জাপান শীর্ষ বৈঠকে ‘পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় ৫০ বিলিয়ন জাপানি ইয়েনের জরুরি ঋণ এবং জ্বালানি, অবকাঠামো ও আইসিটি খাতে প্রায় ৬.৩ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে নবায়নযোগ্য শক্তির পাশাপাশি এলএনজি অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ চাওয়া হয়।

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনায় বড় অঙ্কের ঋণ ও এলএনজিই প্রাধান্য পায়। অথচ জাতীয় গ্রিড আধুনিকায়ন ও দেশীয় ব্যাটারি প্রযুক্তির বিকাশ সবচেয়ে জরুরি। এগুলো বাদ দিয়ে আমদানি বাড়ালে তা দেশের কাঁধে ঋণের বোঝা বাড়াবে।

নীতিগত সমন্বয়হীনতা ও জলবায়ু ঋণের ঝুঁকি: শরীফ জামিল

ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়কারী এবং ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-র সদস্য সচিব শরীফ জামিল বলেন, “সঞ্চালন গ্রিডকে স্মার্ট করা, ব্যাটারি স্টোরেজ অবকাঠামো স্থাপন করা এবং সোলার সিস্টেম স্থাপন করার সিদ্ধান্ত একটি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনা জরুরি। বিচ্ছিন্নভাবে কোন একটি বিষয়ে এগিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জিত হবে না। বরং তা নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনাকে নষ্ট করে নোংরা কয়লা, গ্যাস আর তেলের প্ল্যান্টগুলোকে অনির্দিষ্টকালের জন্য টিকে থাকতে সহায়তা করতে পারে।”

আসন্ন কপ-৩১ সম্মেলন ও আন্তর্জাতিক ঋণ প্রসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, “বিদ্যুৎ বিভাগ নিজেদের দূর্বলতা উত্তরণ করে আন্তর্জাতিক তহবিল থেকে অর্থ আদায়ে কতটা সক্ষম তা দেখতে হবে। কপ-৩১ এ গিয়ে যদি স্মার্ট গ্রিড ও ব্যাটারির জন্য উন্নত বিশ্বের বাণিজ্যিক ঋণ নেওয়া হয়, তবে তা বাংলাদেশকে নতুন ‘ক্লাইমেট ডেট ট্র্যাপ’ বা জলবায়ু ঋণের ফাঁদে ফেলবে। দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক যেকোনো অর্থায়নেই হোক ঐতিহাসিক দূষণের ক্ষতিপূরণ হিসেবে উন্নত বিশ্বকে এই প্রযুক্তি ও অর্থ অনুদান হিসেবে দিতে বাধ্য করতে হবে; জাতীয় অব্যবস্থাপনার দায় কোনো অবস্থাতেই ঋণে রূপান্তর করা যাবে না।”

সিন্ডিকেটে আটকে আছে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ

সরকার যখন বৃহৎ আমদানিকারকদের জন্য শুল্ক ছাড় দিচ্ছে, তখন সাধারণ উদ্যোক্তা ও বাসাবাড়ির ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ (রুফটপ সোলার) বিতরণ কোম্পানিগুলোর জটিলতায় আটকে আছে। আইইইএফএ-র তথ্যমতে, দেশে ৩ থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট রুফটপ সোলারের সম্ভাবনা থাকলেও বিতরণ সংস্থাগুলোর অনাগ্রহে এর বাস্তবায়ন এখনো ১ হাজার মেগাওয়াটের নিচে।

বিতরণ সংস্থাগুলোর আয়ের মূল উৎস শিল্প ও বাণিজ্যিক গ্রাহক। গ্রাহক নিজে বিদ্যুৎ তৈরি করলে বিক্রি কমে যাবে—এই ভয়ে ডিপিডিসি, ডেসকো ও আরইবির মতো সংস্থাগুলো ‘গ্রিড সক্ষমতা নেই’ কিংবা ‘রিভার্স পাওয়ার ফ্লো’-এর অজুহাতে নেট-মিটারিংয়ের ফাইল আটকে রাখছে।

দরজায় কড়া নাড়ছে সোলার ই-বর্জ্যের সংকট

আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য শক্তি সংস্থার (আইরেনা) হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের পর থেকে দেশে প্রথম প্রজন্মের সোলার হোম সিস্টেম ও প্ল্যান্টগুলো থেকে কয়েক লাখ টন প্যানেল বর্জ্যে পরিণত হবে।

সৌর প্যানেলে ক্ষতিকর সিলিকন, ক্যাডমিয়াম ও সিসা থাকে। তবে এগুলো পুনর্ব্যবহার বা নিরাপদ অপসারণের কোনো জাতীয় নীতিমালা এখনো নেই। মেয়াদোত্তীর্ণ প্যানেলগুলো সাধারণ ভাঙারির দোকানে অনিরাপদভাবে ভেঙে কাচ আলাদা করা হচ্ছে। বাকি বিষাক্ত অংশ ফেলা হচ্ছে উন্মুক্ত জলাশয় বা মাটিতে। ফলে তথাকথিত পরিবেশবান্ধব রূপান্তর কৃষিজমি ও পানির জন্য মারাত্মক রাসায়নিক বিপর্যয় ডেকে আনছে।

আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে দেশীয় উদ্ভাবন ও গ্রিন জবসের তাগিদ: সাইদুর রহমান সিয়াম

জলবায়ু ন্যায়বিচার কর্মী এবং ব্রাইটার্স-এর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক সাইদুর রহমান সিয়াম বলেন, “নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে সরকারের এই উদ্যোগ একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সঞ্চালন সক্ষমতা, গ্রিড আধুনিকায়ন, জ্বালানি সংরক্ষণ বা স্টোরেজ অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সাশ্রয়ী স্টোরেজ প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।”

তিনি আরও বলেন, “সৌরবিদ্যুৎ খাতকে শুধু যন্ত্রাংশ আমদানিনির্ভর না রেখে দেশীয় উৎপাদন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরির দিকে এগিয়ে নিতে হবে। এ খাতে স্টার্টআপ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন, নীতিগত সহায়তা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারের পাশাপাশি তরুণদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান ও স্থায়ী ‘গ্রিন জবস’ তৈরি সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সৌর প্যানেলের জীবনচক্র শেষে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পুনর্ব্যবহারের কার্যকর নীতিমালা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে এই রূপান্তর পরিবেশগতভাবে টেকসই হয়।”

তিনি বলেন, “সামনে কপ-৩১-কে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের উচিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, উদ্ভাবন এবং ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তরের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা। নতুন ঋণের বোঝা না বাড়িয়ে উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে জলবায়ু ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে অনুদান, সহজলভ্য প্রযুক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা আদায়ের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। সঠিক নীতিগত সহায়তা, উদ্ভাবন এবং তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে সরকারের এই উদ্যোগ বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”

কপ-৩১-এর আগে নীতিগত জবাবদিহির ডাক

তুরস্কে অনুষ্ঠেয় ৩১তম জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনের (কপ-৩১) আগে বাংলাদেশের হাতে সময় কম। বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিলের ন্যায্য হিস্যা দাবি করার নৈতিক ভিত্তি তখনই তৈরি হবে, যখন দেশের অভ্যন্তরীণ নীতিতে জবাবদিহি ও সমন্বয় নিশ্চিত হবে।

কেবল শুল্ক ছাড়ের ওপর নির্ভর না করে সঞ্চালন গ্রিড আধুনিকায়ন, ব্যাটারি স্টোরেজ স্থাপন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালা প্রণয়নই এখন জ্বালানি নিরাপত্তা ও জলবায়ু ন্যায়ের পূর্বশর্ত। অন্যথায়, এই ‘সবুজ রূপান্তর’ দেশের বিদ্যুৎ খাতকে দীর্ঘমেয়াদে জীবাশ্ম সিন্ডিকেটের চাপ ও আন্তর্জাতিক ঋণের ফাঁদে আটকে ফেলবে।