আনিকা তাবাসসুম রিশা:
“ক্লাস টু’তে উঠে আমি আরেকটি অপকর্ম করি। যে-রূপবতী বালিকা আমার হৃদয় হরণ করেছিল, তাকে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে ফেলি। গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করি বড় হয়ে সে আমাকে বিয়ে করতে রাজি আছে কি না। প্রকৃতির কোনাে-এক অদ্ভুত নিয়মে রূপবতীরা শুধু যে হৃদয়হীন হয় তা-ই না, খানিকটা হিংস্র স্বভাবেরও হয়। সে আমার প্রস্তাবে খুশি হবার বদলে বাঘিনীর মতাে আমার উপর ঝাপিয়ে পড়ে। খামচি দিয়ে হাতের দু-তিন জায়গার চামড়া তুলে ফেলে। স্যারের কাছে নালিশ করে। শাস্তি হিসেবে দুই হাতে দুটি ইট নিয়ে আমাকে নীলডাউন হয়ে বসে থাকতে হয়।”
.
উপরের কথাগুলো বাংলাদেশের একজন জনপ্রিয় লেখকের আত্মজীবনী থেকে নেওয়া। নিশ্চয়ই আপনাদের জানতে ইচ্ছে করছে এতো দুষ্ট স্বভাবের ছিলেন কোন লেখক? আমি বলছি, বাংলাদেশের জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক, নন্দিত কথা সাহিত্যিক, সফল চলচ্চিত্র নির্মাতা, গীতিকার সহ নানা গুণে গুণান্বিত ব্যক্তি হুমায়ূন আহমেদ এর কথা। পাঠককে মুগ্ধ করবার এক অদ্ভুত ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছিলেন এই মানুষটি। আজ বিখ্যাত এই লেখকের ৭২ তম জন্মবার্ষিকী।
.
১৯৪৮ সালের ১৩ ই নভেম্বর, রাত দশটা ত্রিশ মিনিট, অসম্ভব এক শীতের রাত। এরকম একটি শীতের রাতে নানার বাড়ি ময়মনসিংহে জন্ম নিয়েছিলেন কিংবদন্তি লেখক হুমায়ূন আহমেদ, যাঁর ডাক নাম কাজল । পিতা ফয়জুর রহমান এবং মাতা আয়েশা ফয়েজের ছয় সন্তানের মধ্যে প্রথম সন্তান তিনি। পিতার খুব ইচ্ছে ছিল প্রথম সন্তানটি মেয়ে হবে। মেয়ের আশায় তিনি জামাও বানিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু তাঁর ‘আশার মুখে ছাই ‘ ঢেলে দিয়ে জন্ম নিল পুত্র সন্তান। ফয়জুর রহমান পেশায় একজন ওসি ছিলেন। তখন তাঁর পোস্টিং ছিল সিলেট। সেখান থেকেই ছেলেকে দেখবার উদ্দেশ্যে ছুটে এলেন ময়মনসিংহে, আর সাথে নিয়ে এলেন মেয়ে বাবুর জন্য বানানো জামাগুলো।
.
মজার ব্যাপার হলো এই মেয়েলি পোশাকগুলো হুমায়ূন আহমেদকে দীর্ঘদিন পরিধান করতে হয় এবং বাবাকে খুশি করার জন্য তাঁর মা তাঁর মাথার চুলও লম্বা রেখে দিতেন। আর সেই চুলে বেণী গেঁথে তাতে নানা রঙের রিবন লাগিয়ে দিতেন।
.
একটা প্রাণোচ্ছল শৈশব পেয়েছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। অবাধ ছিল তাঁর স্বাধীনতা। বাবার পোস্টিং এর কারণে ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তরে। নিজের ইচ্ছে মত রাজত্ব করতেন নিজ রাজ্যে। খুব দুষ্ট প্রকৃতির ছিলেন তিনি। কে জানতো তখন, এই দুরন্ত বালকটি একদিন বড় হয়ে বিখ্যাত মানুষদের একজন হয়ে যাবেন।
.
“পৃথিবীতে আসার সময় প্রতিটি মানুষই একটি করে আলাদিনের প্রদীপ নিয়ে আসে, কিন্তু খুব কম মানুষই সেই প্রদীপ থেকে ঘুমন্ত দৈত্যকে জাগাতে পারে।”
.
হুমায়ূন আহমেদ কিন্তু তাঁর ঘুমন্ত দৈত্যকে জাগাতে বেশ সফল ছিলেন। খুব কম সময়ে তিনি তাঁর লেখা দিয়ে স্থান করে নেন পাঠক মনে, সৃষ্টি করেন অসংখ্য পাঠক। আমার মনে হয়, শুধু মাত্র তাঁর বই পড়ে বই পড়ার প্রতি আগ্রহী হয়েছেন এমন পাঠকের সংখ্যাটা হিসেব করলে বেশ বড় হবে।
.
আমার দৃষ্টিতে হুমায়ূন আহমেদ একজন সফল সাহিত্যিক, যিনি তার লেখার মাধ্যমে একজন পাঠককে প্রাণ খুলে হাসাতেও পেরেছেন আবার গভীর দুঃখ উপলব্ধি করিয়ে কাঁদাতেও পেরেছেন। একদিকে তিনি যেমন মিসির আলী, হিমু সম্পর্কিত বই লিখে পাঠককে বিনোদন দিতে সক্ষম হয়েছেন, অন্যদিকে অসাধারণ কিছু বই যেমন – ‘নন্দিত নরকে’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘বাদশাহ নামদার’, ‘জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাইস্কুল’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘মাতাল হাওয়া’, ‘লিলুয়া বাতাস’, ‘দেয়াল’ সহ আরো অনেক ভালো ভালো তথ্য সমৃদ্ধ এবং শিক্ষণীয় বই লিখে পাঠকের কাছে বেশ সমাদৃত হয়েছেন।
.
হুমায়ূন আহমেদ শুধু লিখেই পাঠকের কাছে সমাদৃত হননি।তিনি চমৎকার সব নাটক এবং চলচ্চিত্র পরিচালনা করেও বেশ সুনাম কুঁড়িয়েছেন। তার চলচ্চিত্রগুলোর একটি সুস্পষ্ট বার্তা থাকতো। তাঁর পরিচালিত উল্লেখযোগ্য নাটক এবং চলচ্চিত্র হলো – ‘আজ রবিবার’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘বহুব্রীহি’, ‘এইসব দিনরাত্রী’, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘চন্দ্রকথা’, ‘ঘেটুপুত্র কমলা’, ‘নয় নম্বর বিপদ সংকেত’ ইত্যাদি।
.
এছাড়াও তাঁর রচিত উপন্যাসের আলোকে অনেক পরিচালক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘নন্দিত নরকে’, ‘দূরত্ব’, ‘আবদার’, ‘কৃষ্ণপক্ষ’ ইত্যাদি।
.
হুমায়ূন আহমেদের বই এতো বেশি পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে যে বইমেলায় গেলেই আমরা দেখতে পারি, তাঁর মৃত্যুর পরেও অন্যপ্রকাশ, কাকলীর সামনে তাঁর বই কিনবার জন্য ভীড় জমে থাকে। একটা সময় ছিল যখন অপেক্ষায় থাকতাম, কবে প্রিয় লেখকের নতুন বই হাতে পাবো, এখন ভাবতে খুব কষ্ট লাগে যে, আর এই প্রিয় লেখকের নতুন বই এর জন্য অপেক্ষা করা হয় না। খুব তাড়াতাড়িই যেন তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন!
.
আমি তাঁর লেখায় এক অন্যরকম স্বাদ পাই, তাঁর বই এ এক অন্যরকম ঘ্রাণ পাই যা তাঁর লেখার সাথে আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখে। তিনি আমার সবচেয়ে প্রিয় লেখক, যাঁর লেখা পড়েই আমার আরো পড়তে ইচ্ছে হয়েছিল, বই সংগ্রহ করার শখ জেগেছিল। আমার প্রিয় লেখকের জন্মদিনে তাঁর প্রতি রইলো বিনম্র শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা।
.
লেখক: শিক্ষাথী, মাস্টার্স, বাংলাদেশ গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

15 − one =