মোঃ আনিসুল ইসলাম:
.

শিক্ষার্থীরা তাদের  স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন সময়ে এমন লম্বা ছুটি আর কখনো পায়নি। বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারীর কারনে গত ১৭ মার্চ  থেকে দীর্ঘ  প্রায় ৬ মাস  দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। যার কারনে  অধিকাংশ শিক্ষার্থীরা তাদের নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করছে। লকডাউন অবস্থায় তারা মিস করছে প্রিয় ক্যাম্পাসের আঙ্গিনা, সবুজ ঘেরা মাঠ, ক্লাসরুম, বন্ধুবান্ধব ও প্রিয় শিক্ষকদের। লকডাউন থাকাকালীন সময়ে ছুটিতে কীভাবে শিক্ষার্থীদের  অবসর দিনগুলি কেটেছে, সেই দিনগুলির কথা ব্যক্ত করেছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের  শিক্ষার্থীরা। এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সাথে কথা হয় বিডিসমাচার প্রতিনিধি আনিসুল ইসলাম এর সাথে।

.
হাছিবুল বাসার, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়:
.
করোনা ভাইরাস থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে বাড়িতে আসি।করোনার প্রাদুর্ভাব না কমায় ক্যাম্পাসে ফিরতে পারছি না। এত দীর্ঘ সময় ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থান করা সত্যিই কষ্টের! তবে নিজেদের স্বার্থেই নিজেরা বাসায় অবস্থান করছি। কারণ, সবকিছুর উর্ধ্বে হচ্ছে বেঁচে থাকা। তবে ঘরবন্দী সময়ে একঘেয়েমিতা দূর করতে পরিবারকে সময় দেওয়ার পাশাপাশি বই পড়ছি। তাছাড়া পত্রিকায় লেখালেখি করাটা এই করোনাকালেই শুরু করলাম।দু,একজন ছাত্র-ছাত্রী পড়িয়ে ধর্ম-কর্ম সম্পাদন করে সময়টা তেমন খারাপ ও যাচ্ছে না।তবে স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা রইল, দ্রুত যেন আমাদের মহাবিপদ থেকে রেহাই দেন। তবেই আমরা প্রাণের ক্যাম্পাসে আবারো হাসি-মুখে ফিরতে পারবো।
.
সাদিয়া নওশিন,পরিসংখ্যান বিভাগ,জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়:
.
এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি যুদ্ধে অনেক ব্যর্থতার পর সবশেষে আমার ভাগ্য পড়ে গেল ঢাকার অন্যতম  স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভেবেছিলাম বন্ধুদের সাথে ভার্সিটির কয়েক বছর অনেক ভালো কাটবে। কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে পুরো বিশ্ব থমকে যাওয়ার সাথে সাথে থেমে গেল আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটানো জীবন। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হল। একে অপরের সুস্থতার জন্য সকলকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান করা হল। তাই এই সময়ে আমার মতো সবাই ঘরে অবস্থান করে বিভিন্ন কাজ করে অবসর সময় কাটাচ্ছে। এই অবসর সময়ে আমি গল্পের বই পড়ে ও বিভিন্ন অনলাইন কোর্স করার মাধ্যমে সময় পার করছি।
.
পাশাপাশি ঘরে আম্মুকে কাজে সাহায্য করছি, আপুর সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করছি,আব্বুর কাছ থেকে অনেক শিক্ষনীয় উপদেশ পাচ্ছি। মাঝেমধ্যেই নিজের পছন্দের কাজগুলো করছি যেমন-ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি অন্যরকম ইচ্ছে ছিল যা ব্যাস্ততার কারণে করা হয়ে উঠেনি। এখন তা করতে পারছি। এছাড়াও অনলাইন এখন বিনামূল্যে অনেক কোর্স করা যাচ্ছে যা ভবিষ্যতে আমার কাজে লাগবে। ঘরে থাকার কারণে অনেক বিরক্তিবোধ হয় মাঝেমধ্যেই। কিন্তু তারপর ই মনে হয় একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাকে সকল স্বাস্থ্যবিধী মেনে চলা‌ লাগবে। তাহলেই এ দেশ থেকে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা কমে যাবে।
.
এস আহমেদ ফাহিম, অনুজীববিজ্ঞান বিভাগ,নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়:
.
করোনা মহামারীর কারণে  মার্চ মাসে ক্যাম্পাস  বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাসায় চলে আসি। প্রথমে ভেবেছিলাম যে,অল্প সময়ের মধ্যে এই পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে। আবার প্রিয় ক্যাম্পাসে ফিরে যেতে পারব।কিন্ত তা আর হয়ে উঠে নি। পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে তাও অনিশ্চিত। দীর্ঘসময় বাসায় থাকার অভিজ্ঞতা আগে কখনো ছিল না,এবার ই প্রথম। ক্যাম্পাসে পড়াশুনার পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠনের সাথে কাজ করা হতো,ব্যস্ত সময় কাটতো। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতিতে ক্যাম্পাসের সেই ব্যস্ত দিনগুলোকে মিস করি।করোনাকালীন এই সময়ে অনলাইনে পাঠদান শুরু হয়েছে এবং সংগঠনের প্রোগ্রাম, মিটিংগুলো অনলাইনেই হচ্ছে।পাশাপাশি স্কিল ডেভেলপমেন্ট এর জন্য অনলাইন কোর্স,বিভিন্ন জার্নাল, পাবলিকেশন থেকে জ্ঞান অর্জনের ভালো সময়  পাচ্ছি। ফলে অনলাইনেই বেশি সময় ব্যয় হয়।এছাড়াও বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়পরিজন দের সাথে অনলাইনে যোগাযোগ রাখছি।করোনাকালীন এই সময়টায় শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি,পরিবারের সদস্যদের সাথে সময় কাটানো, নিয়মিত পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ,নিয়মমাফিক ঘুম এই বিষয়গুলো মেনে চলি।আশা করি,করোনা মহামারি পরিস্থিতি দ্রুত সময়ের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।আবারো সুস্থভাবে প্রিয় ক্যাম্পাসে ফিরে যেতে পারব ইনশাআল্লাহ।
.
নাঈমা আক্তার মুন, প্রত্নতত্ব বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়:
.
স্বাভাবিকভাবেই চলছিল সবকিছু। হঠাৎ স্বাভাবিক জীবনে ছন্দ পতন ঘটে। আমাদের জীবনে কাল হয়ে আসে মহামারী করোনা। হঠাৎ করেই ১৭ ই মার্চ বন্ধ হয়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয়। ভেবেছিলাম হয়তো একসপ্তাহ বা সল্পস্থায়ী বন্ধ হবে। কিন্তু দেখলাম বন্ধ দীর্ঘস্থায়ী হতে শুরু করেছে। বন্ধের  প্রথম দিকে শুয়ে বসে অলস দিনযাপন করেছি। প্রিয় ক্যাম্পাসকে অনেক বেশি মিস করেছি। ক্যাম্পাসের ফেলে আসা স্মৃতিগুলো বেশি আবেগ তাড়িত করেছে। বন্ধুদের সাথে ঘুরাঘুরি, বিকেলে শহীদ মিনারে আড্ডা, নবী মামার দোকানে চা খাওয়া, সেইসাথে প্রিয় শিক্ষকদের পড়ানো, মিডর্টাম ও প্রেজেন্টেশনের তাড়াকে খুব মিস করেছি। আর এগুলো ভেবে ভেবেই হতাশ লাগতো। পরবর্তী অনুধাবন করলাম আর এভাবে কতদিন? নতুন করে ভাবতে হবে। এই অবসর সময়ে অনলাইন গ্রাফিক্সের কাজ শিখেছি, বিভিন্ন অনলাইন কোর্সের দিকে মন দিয়েছি।
.
আমি  অনুপ্রাস কন্ঠ চর্চা কেন্দ্র সংগঠনের সাথে যুক্ত আছি। সংগঠনের বিভিন্ন কাজ করেছি সেইসাথে সংগঠন থেকে লাইভ কবিতা আবৃত্তি করেছি।বলা যায়, কবিতা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করেছি। পাশাপাশি মা কে সাহায্য করা, পরিবারের সাথে সময় কাটানো, বন্ধুদের খোঁজখবর নেওয়া, এখন তো অনলাইন ক্লাস শুরু  হয়েছে তাই ক্লাস করা ইত্যাদির সাথে থেকে আমার সময় কেটে যাচ্ছে।নিউ নরমাল ছন্দে আবার জীবন নতুন গতিতে চলছে।তবুও প্রত্যাশা করোনা কাটিয়ে আমারা খুব শ্রীঘ্রই আশার আলো দেখবো। আমাদের প্রতিটি পদচারণা হবে আমাদের প্রাণের ক্যাম্পাসে।
.
শাহারিয়ার বেলাল, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় :
.
মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের আতঙ্কে রয়েছে গোটা বিশ্ব। সেই তালিকা থেকে বাদ পড়েনি বাংলাদেশ। সেই সাথে বন্ধ হয়েছে আমার প্রিয় ক্যাম্পাস। সারাক্ষণ ক্যাম্পাসে কাটানো মুহুর্তগুলো বার বার হৃদয়টাকে সৃতিকাতর করে তোলে। গৃহবন্দীর দিনগুলিতে আমি যেভাবে প্রত্যেকটি দিনকে আনন্দময় করে তোলার উপায় খুজেছি সেগুলোই তুলে ধরার চেষ্টা করছি আমার এই লেখায়:
.
বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের পর থেকে সময়গুলো যেনো একঘেয়েমি লাগতে শুরু করে। কখনো ভাবিনি দীর্ঘ সময় এভাবে কাটাতে হবে।
.
করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে যখন একমাত্র ঘরে থাকাই হলো বড় প্রতিরোধ যুদ্ধ,তখন নিঃসঙ্গতাকে দূর করতে শুরু করি পরিবারকে বেশি বেশি সময় দেয়া। তাই এই ভাইরাসকে যত বেশিই অভিশাপ দেই না কেনো,ঘড়ে থাকার সময়টা কিন্ত এর কারনেই। এটাই পরিবারের সাথে নিজের মতো করে সময় কাটানোর সূবর্ণ সুযোগ। এছাড়াও মাকে রান্নার কাজে সাহায্য করা, নিয়মিত সালাত আদায় করা, আত্নীয়স্বজনদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা আর বন্ধুদের সাথে স্বাস্হ্যবিধি মেনে ঘুরাঘুরিতো থাকছেই। করোনাভাইরাসের থেকে নিরাপদ থাকতে প্রয়োজনীয় পরামর্শগুলো পরিবার ও অন্যান্যদের সাথে শেয়ার করে তা যথাযথভাবে অনুসরণ করতে উৎসাহিত করি। বইয়ের থেকে ভাল বন্ধু আর কি বা হতে পারে। তাইতো অবসর সময়ে সাহিত্য এবং ইতিহাস বিষয়ে কিছু বই পড়ার চেষ্টা করছি।এছাড়াও সময় কাটাচ্ছি বিভিন্ন পত্রিকায় চিঠিপত্র কিংবা কলাম লেখালেখির মাধ্যমে।
.
এভাবেই করোনার মূহুর্তে সময় অতিবাহিত করছি এবং  সৃষ্টিকর্তার কাছে  আবেদন করছি খুব তাড়াতাড়ি যেন  করোনা মহামারী থেকে মুক্তি দেন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে