মো.হাছিবুল বাসার মানিকঃ

বাংলাদেশের সকল সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের প্রায় প্রতিটি অর্জনের পেছনে যে অনন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভূমিকা রেখেছে সেটি- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।একটি পৃথক জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সরাসরি নেতৃত্ব দিয়ে পৃথিবীর বুকে অসামান্য নজির স্থাপন করা একমাত্র প্রতিষ্ঠানও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস জাতীয় প্রয়োজনের প্রতিটি মুহূর্তে জাগরণের চারণভূমি হিসেবে কাজ করেছে।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরাই ছিলেন অগ্রগামী। জাতির বাতিঘর হিসেবে যুগ যুগ ধরে আলো বিলিয়ে চলা গর্বের এ বিশ্ববিদ্যালয় আজ পা রাখছে শতবর্ষে। আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মদিন, ৯৯তম জন্মবার্ষিকী।কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রভাবে আজ ক্যাম্পাসে বিচরণ নেই শিক্ষার্থীদের।ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ হওয়ার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে সৃষ্টি হয়েছে সেশনজটের আশঙ্কা।

১৯২১ সালের ১ জুলাই আজকের এই দিনে পূর্ববাংলায় জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল দেশের সর্বোচ্চ এই বিদ্যাপীঠ। সেই থেকে দিনটি ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। টানা ৯ দশকে এই বিদ্যাপীঠ তৈরি করেছে বহু জ্ঞানী-গুণীজন, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, বিজ্ঞানী, শিক্ষক আর লাখ লাখ গ্র্যাজুয়েট। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে অবদান রেখেছেন তারা।

প্রতিবছর ভর্তি পরীক্ষায় সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতাও হয় তীব্র। কিন্তু এর পরের অবস্থাগুলো মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়। বিশেষত শিক্ষার মান, গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।বিশেষত, যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা কতটা পূরণ হয়েছে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফেরেন অনেকে।বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকটের সমাধান,কেন্দ্রীয় ও হল লাইব্রেরীতে সিট সংকট,গণরুম-গেস্টরুম প্রথা উচ্ছেদ, অছাত্র-বহিরাগত বিতাড়ন, সান্ধ্যকালীন বাণিজ্যিক কোর্স বন্ধ, গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো, পরিবহন সমস্যা দূর করা, ক্যান্টিনে খাবারের মান বাড়ানো, সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিল, ক্যাম্পাসে বাইরের যান চলাচল বন্ধ সমস্যার আজও কোনো সমাধান হয় নি।তাছাড়া বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে যুগোপযোগী শিক্ষা পদ্ধতি চালুর গলদ তো আছেই।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‍্যাংকিংয়ের বৈশ্বিক তালিকায় একারণেই হাজারো ঐতিহ্যের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান পিছিয়ে আছে।যাই হোক,আমাদের উচিত অতি শীঘ্রই সংকটগুলো কাটিয়ে উঠা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত ঐতিহ্য ও সুনাম পুনরুদ্ধারে ঢাবির শতবর্ষে প্রত্যাশা থাকবে যেন দ্রুত আবাসন সংকট নিরসন,করোনায় সেশনজট মোকাবেলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া,সন্ধ্যাকালীন কোর্সসমূহ বাতিল,লাইব্রেরীতে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা,শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণা অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি করা, সর্বোপরি ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি না করে সুষ্ঠু রাজনীতি এবং গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করে সকলের মতামত পেশ করার সুযোগ সৃষ্টির সমাধান নিশ্চিত করে জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য যেন তুলে ধরা হয়।বিশ্ববিদ্যালয়টা যেন কোন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে পরিণত না হয় সেটাই আশা রাখবো। জ্ঞান চর্চা বাদ দিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী যেন প্রমোশন কিংবা ক্ষমতার পেছনে না দৌড়ায় সেটাই প্রত্যাশা করবো।তবেই পূর্ণ হবে শতবর্ষের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি।ক্যাম্পাস হবে জ্ঞান অর্জন, সংস্কৃতি ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার উদ্যান।

লেখকঃ শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।ইমেইলঃ[email protected]

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

1 + nine =