মোঃ শফিকুল ইসলাম:

বনভোজনে যাওয়ার জন্য বেশ কয়দিন ধরেই নানা জল্পনা কল্পনা চলছিল। অবশেষে সব পরিকল্পনা বাস্তবয়তায় রুপ পেল বটে, কিন্তু বনভোজনের দিন এমন একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল যেটা সমস্ত দিনটাকে বিষাদময় করে দিল। বনভোজনের দিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠলাম, উঠে ডিপার্টমেন্টে চলে গেলাম সকাল ৬ টা ৪৫ মিনিটে। সবার মাঝেই এক রকম উতফুল্ল ভাব বিরাজ করছিল। একই রঙয়ের টি-শার্ট পরে সবাই একে একে বাসের আসন দখলে মত্ত হয়ে উঠেছিল।

৭ টা ৪৫ মিনিটে বাস নাটোরের গ্রীণ ভ্যালির উদ্দেশ্যে ক্যাম্পাস থেকে রওনা হয়। আমাদের চারটি স্থান দেখতে যাওয়ার কথা আলোচনা করা হয়েছিল। সেই সূত্র ধরে প্রথমে পুঠিয়া জমিদার বাড়ি যাওয়া হয়।সেখানে সকালের নাস্তা শেষে আমরা যথারীতি গ্রীণ ভ্যালির উদ্দেশ্যে জমিদার বাড়ি ত্যাগ করি ৯ টা ৫ মিনিটে। আমি বাসে যেতে যেতে একটা বিষয় লক্ষ্য করলাম ওই অঞ্চলের রাস্তা গুলি কেমন সরু। সেখানে দুটো বাস একসাথে যাওয়া খুবই কঠিন অর্থাৎ ডবল লেন হলেও খুবই সরু।

আবার গ্রামের ভিতর রাস্তা হওয়ায় আরেকটি বিষয় নজরে আসল যে গ্রামের লোকেরা তাদের সাপ্তাহিক বা দৈনিক যে হাট-বাজারের কেনাকাটা সেটা মূল সড়ক এর উপর অস্থায়ী দোকান বসিয়ে সম্পন্ন করছেন। একেত রাস্তা সরু আবার তার উপর হাট বসিয়ে ভিড় জমিয়ে রেখেছেন। সঙ্গত কারনেই আমাদের জ্যামের মধ্যে পরতে হয়েছে। আমরা জ্যাম কাটিয়ে আসতে আসতে একটি ব্রিজের উপর উঠলাম সেখানে জ্যামের আকার আরো প্রকটভাবে দেখা দিল। গাড়ি খুব ধীর গতিতে আগাচ্ছিল। রাস্তা খুব সরু হওয়ার কারনে গাড়ি বাম পাশে খুব বেশিই ঘেষে থাকে।

রাস্তার বাম দিক ঘেষে আবার এক ভিক্ষুক বসে বসে ভিক্ষা করছিল। আমাদের গাড়ির চালক ওই ভিক্ষুক টির খুব কাছে এসে ব্রেক কষে । পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে আর এক চুল পরিমাণ আগালে ভিক্ষুকটি মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হতে পারত। এমন অবস্থা থেকে উত্তরনের জন্য গাড়ির চালক গাড়িকে একটু পিছনের দিকে দেয়। এই পিছনে দেয়াই কাল হল! আমাদের গাড়ির পিছনে একটি মটর সাইকেল ছিল। গাড়ি হঠাত পিছনে দেয়ার কারনে ওই মটর সাইকেলের সামনের দিকটা একটু ক্ষতিগ্রস্থ হয়। যদিও মটর সাইকেলের এত নিকটবর্তী হয়ে বাসের পিছনে দাঁড়ানো উচিৎ হয়নি। যে মটর সাইকেলের সাথে এরকম ঘটনা ঘটে ওই চালক ছিলেন ওই জায়গার স্থানীয়।

বনভোজনের সাথে আমাদের দুইজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ছিলেন। মটর সাইকেল চালক তার স্থানীয় আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে এসে আমাদের গাড়ীর গতিরোধ করে । আমাদের শিক্ষক মহোদয়গ্ণ তাদের কে মটর সাইকেলের ক্ষতিপূরণ বাবদ টাকা দিলেও তারা আমাদের শিক্ষকদের সাথে নানা কুরুচিপুর্ন উচ্চবাচ্চ্য করতে থাকে যা আমাদেরকে রীতিমত পীড়া দেয়। ১০ মিনিট পার হয়ে গেলেও যখন আমরা দেখলাম যে আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকগ্ণ গাড়িতে আসছেন না তখন মেয়েরা বাদে আমরা ছেলেরা সবাই গাড়ি থেকে নেমে গেলাম। তাদের সাথে আমাদের রীতিমত বিবাদ বেধে গেল। তাদের একেক জন আমাদের দিকে তেড়ে আসছিল।

আমরা শতবার তাদের বললাম যে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী,আমাদের দ্বিতীয় বর্ষের সবাই মিলে বনভোজনে যাচ্ছি আজকের মধ্যেই ফিরতে হবে , আমাদের হাতে সময় কম , আমরা ধরেই নিচ্ছি আমাদের গাড়ির চালকের ভুল ছিল এখন আমাদের যেতে দিন। তারা তো আমাদের বুঝার চেষ্টা করলই না উলটো আমাদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা শুরু করল। তারা সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের ন্যায় আমাদের গাড়ির দিকে তেড়ে আসছিল। তাদের অন্য কি উদ্দেশ্য ছিল আমার জানা নাই। আমাদের সাথে যারা মেয়েরা ছিল তারা তো রীতিমত কান্নাকাটি শুরু করেছিল। এমনকি আমাদের কয়েকজন ছেলের গায়ে হাত পর্যন্ত দিয়েছিল। সারা মাসের কল্পনার ফসল বনভোজনের আনন্দ নিমিষেই বিষদে রুপ নিল।

বেশ কয়েকজন থানায় ফোন করে আমি ব্যাক্তিগত ভাবে পুলিশ হেল্প লাইনে ফোন করে তাদের সাহায্য চাই। যাই হোক প্রায় আধা ঘন্টা পরে তারা সমাধানে আসে আমরা যেন তাদের বড় কোন ক্ষতি না করি তারা এই আর্জি আমাদের কাছে পেশ করে ক্ষমা চেয়ে নেয়। অবশেষে এই উৎকট পরিস্থিতি কাটিয়ে আমরা যখন সবাই গাড়িতে উঠি তখন পুলিশ আসে। তখন পুলিশ এসে ঠিক কি করেছিল তা আমার তথ্যের মধ্যে নাই। যাইহোক গাড়ি আবার যাত্রা শুরু করল।গন্তব্য গ্রীণ ভেলি। এই ঘটনার আগ পর্যন্তও যে আমেজ সবার মাঝে ছিল তা একেবারেই বিনষ্ট হয়ে গেছে। সবার মাঝে হতাশার ছাপ।

কেউ কিছু সময়ের জন্য সশব্দে প্রশাস গ্রহণ করেনি।আমাদের শিক্ষক মহোদয়গ্ণ আমাদের হতাশা, ক্ষোভ এবং ভয় কাটিয়ে উঠার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ন কথা বললেন। তারা আমাদের আকস্মিক ওই দুর্ঘটনার কথা মন থেকে ঝেরে ফেলে দিয়ে পরবর্তি বনভোজনের যে ইভেন্ট আছে সে দিকে মননিবেশ করতে উৎসাহ দিলেন। আমরা বেলা ১২ টায় আমাদের কাংখিত স্থান গ্রীণ ভেলিতে পৌছি।  সেখানে আমাদের খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন সহ আরো বেশ কিছু চমকপ্রদ সাংস্কৃতিক আয়োজন ছিল। কিন্তু সবার মাঝ থেকে ওই রাস্তায় ঘটে যাওয়া  ঘটনার রেশ কাটছিলনা।

আমরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান গুলো করার আগে পুরো পার্কটি একবার ঘুরে দেখি এতে মনে কিছুটা সতেজতা ফিরে আসে। এতশত ঘটনার মাঝে আমার এক বন্ধু আমাকে হটাত কানে কানে ফিসফিস করে বলল যে পুরো পার্ক ঘোরার সময় হঠাত নাকি তার প্যান্টের তলার সুতা আলগা হয়ে ফাকা হয়ে গেছে এজন্য সে নাকি সবার সাথে একসাথে বসে খাতে পারবেনা এতে নাকি সে লজ্জার মধ্যে পরে যাবে। তার এই ঘটনা শুনে মনের মধ্যে হঠাত এক রকম পৈশাচিক আনন্দ অনুভব করলাম।

অট্টহাসি দিয়ে ফেটে পরতে ইচ্ছা করা সত্ত্বেও বন্ধুর ইজ্জত এর কথা সামনে রেখে সেটাকে চাপা দিতে হয়েছে। সারাদিন নাচ-গান, কবিতা আবৃতি এবং সর্বশেষে দুপুরের খাওয়া খেয়ে আমরা গ্রীণ ভ্যালি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরতি পথে নাটোর জমিদার বাড়িতে একটু দৃষ্টি দেই। সেখানে গিয়ে ব্যাক্তিগত ভাবে আমি যা আবিষ্কার করি তা হল জমিদারেরা আভিজাত্যের এক অন্যতম নিদর্শন তৈরি করে গেছেন। শতবছর আগের তাদের স্থাপত্য এবং ব্যবহার্য জিনিস গুলো এখনো যেরকম ঝকমকে আছে তখন যে কিরকম ছিল তা সহজেই অনুমেয়। সময় স্বল্পতার কারনে আমরা বেশ কিছু স্থান দেখে আসতে পারিনি। সবশেষে আমরা দিনটিকে ভালোই উদযাপন করেছি। আরো ভাল হত যদিনা ওই অনাকংখিত দুর্ঘটনা না ঘটত। তবে ওই দুর্ঘটনাও আমাদের কিছু শিক্ষা দিয়েছে যা আমাদের পরবর্তী সময়ে কাজে লাগবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে