মোহম্মদ শাহিন:
আমাদের সমাজে এখন পর্ণোগ্রাফির মহা আসক্তি বিরাজমান। আজকাল শুধু তরুণরা নয় সকল বয়সের মানুষ পর্ণোগ্রাফি নামক নিকষ কালো জগতের বাসিন্দা। গুটিগুটি পায়ে যখন একজন শিশু, কিশোর, তরুণ, যুবক এ জগতের কিনারায় এসে দাঁড়ায়, অতল গহ্বর গ্রাস করে নেয় তাকে। এই পর্ণোগ্রাফির কারণেই সমাজের সকল শ্রেণীর নারীরা যৌন আকাঙ্ক্ষার দৃষ্টিতে পরিণত হয়েছে।
.
নারীরা যে পুরুষের যৌন আকাঙ্ক্ষার দৃষ্টিতে পরিণত হয়েছে তার প্রথম স্টেপ হচ্ছে ভারতীয় সিরিয়াল অর্থাৎ হলিউড, বলিউড সহ পশ্চিমা অশালীন সিনেমা। এসব সিনেমাতে নারীদের এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যে, সে নারী শুধুমাত্র মনোরঞ্জনের বস্তু হিসেবে উপগণিত হয়। এখানে যেভাবে অর্ধ-লগ্ন নারীর দেহ প্রদর্শন করা হয়ে থাকে স্বাভাবিকভাবেই একজন কিশোর, তরুণ বা যুবকের স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাইকোলজি উতপ্ত হয়ে উঠে।
.
আবেগ ঢু মারতে চায় পর্ণসাইটে ।আপনাআপনি মনের অজান্তেই হারিয়ে যায় নীল দুনিয়ায়। আপনি কি জানেন, প্রতি মূহুর্তে বিশ্বের অন্ত্যত ৩৭২ জন মানুষ গুগল সার্চে লিখছেন আ্যাডাল্ট বা পর্ণ জাতীয় সিনেমা। ‘মানুষ মানুষের জন্য’ একটি বেসরকারি সংস্থা আমাদের দেশের স্কুল ছাত্রদের নিয়ে একটি জরিপ করছিল এবং তারা জানিয়েছিল, রাজধানীর ৭৭ শতাংশ শিক্ষার্থী পর্ণগ্রাফিতে আসক্ত। তারা এ সমীক্ষাটি চালিয়েছিল অষ্টম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মধ্যে। এছাড়াও সংস্থাটি আরোও বলেছে, যাদের বয়স ৩০-৩৫ তারা একবার হলেও পর্ণোগ্রাফি দেখেছেন এবং এদের মধ্যে নিয়মিত পর্ণ দেখেন ৯০ ভাগ পুরুষ এবং যুবানারীদের সংখ্যা ৫০ ভাগ।
.
ইংরেজিতে একটি কথা আছে, We become what we eat and see অর্থাৎ মানুষ যা খায় বা দেখে তারা সেভাবেই বেড়ে উঠে। পর্ণোগ্রাফি একজন মানুষকে দুর্ধর্ষ, অমানবিক ও ধর্ষক বানায়। আমাদের দেশে যে এতএত ইফটিজিং, যৌন হয়রানি এবং ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে এর ইন্ধন যোগাচ্ছে এই পর্ণগ্রাফি। কেননা, পর্ণোগ্রাফি মানুষকে বাস্তব জগত থেকে ফ্যান্টাসির জগতে নিয়ে যায়। আর ফ্যান্টাসির জগতের সাথে বাস্তবের অমিল থাকায় পর্ণোদর্শক দুর্ধর্ষ হয়ে যায়।
.
সংশ্লিষ্ঠ গবেষকের মতে, একজন রেপিস্ট হঠাৎ করেই রেপিস্ট হয়ে উঠে না। তার রেপিস্ট হওয়ার পূর্বের ধাপগুলো সম্পর্কে এনালিস্টরা বলেছেন প্রথমত সিনেমায় প্রদর্শিত সফট পর্ণোগ্রাফিতে নারীর বস্তুকরণ করা হয় এবং এরই প্রভাবে সিনেমার দর্শক শ্রোতা হার্ড পর্ণোগ্রাফির দিকে ধাবিত হয়। আমি ছোট্ট একটি উদাহরণ দিচ্ছি -ভার্সিটিতে ভর্তির সবেমাত্র হলে উঠেছি। একজন ছেলের সাথে পরিচয় হলো খুবই পরহেজগার, নামাজি, আল্লাহওয়ালা ব্যক্তি। খুবই সহজ-সরল ছেলেটা। কোন মেয়ের সাথে মিশতেও তাকে দেখিন। কয়েকমাস যাবার পর হঠাৎ ই একদিন তার ফোন ঘাটতেই দেখলাম একটি ফ্লোডার পর্ণগ্রাফি দিয়ে ভরপুর। মূহুর্তেই চমকে উঠলাম, স্তম্ভিত হয়ে কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেললাম। বেশকয়েকদিন পরে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ছেলেটা অনেক ভাবার পর বলতে লাগলো ফেইসবুক স্ক্রল করতে করতে সুন্দরী নারীদের প্রতি ভালো লাগা কাজ করা এবং ভারতীয় বেশকিছু অশালীন সিনেমা থেকেই পর্ণোগ্রাফির দিকে ধাবিত হওয়া। অতঃপর মাথা নিচু করে চলে গেলেন। সাধারণ আট-দশটা ছেলের মতোই এই আল্লাহওয়ালা, নামজাী ছেলেটাও মনের অজান্তেই হারিয়ে গেছেন এই নীল দুনিয়ায়।
.
আপনার কাছে বিষয় টি বিশ্বাস করা দুরূহ লাগতে পারে কিন্তু এ কথাটির নিরেট বাস্তবতা রয়েছে। আমি শুধুমাত্র এরকম একটি উদাহরণ দিলাম, আপনার চারপাশে এরকম হাজারো কর্কট বাস্তবতা রয়েছে খুঁজলেই পেয়ে যাবেন। আমরা সাধারণ শিশু, কিশোর, তরুণ এবং যুবকরা তো এই ব্যভিচারে লিপ্ত রয়েছিই সাথে সাথে হজুর সম্পদ্রায়েরও এই সংখ্যাও কিন্তু কম নয়। আমি এটা নিজের অভিজ্ঞতা এবং বাস্তবতার আলোকেই তুলে ধরলাম। আচ্ছা আপনি বলুন তো এই পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রের মেরুদন্ড কারা? আজকের এই শিশু, কিশোর, তরুণ এবং যুবকরা। কিন্তু আপনি কি লক্ষ্য করেছেন যেখানে আজকের এই শিশু, কিশোর, তরুণ এবং যুবকদের গবেষণা ও শিক্ষা তথা জ্ঞানের বিকাশ এবং সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডসহ সাড়া ফেলে বিশ্ব জয়ের স্বপ্নের পথে হাটার কথা তারা আজ নীল দুনিয়ার পথে হাটছে।
.
আজ সমাজের মেরুদন্ড মারাত্মকভাবে ভেঙ্গে যাচ্ছে। আপসোস! ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, পর্ণগ্রাফি দেখার ফলে মানুষের মতিষ্ক চড়া মাদক সেবনকারীর মতিষ্কের মতো হয়ে যায়। এটি মাদক সেবন কারীর মতোই ভয়ানক এবং অভ্যাসে পরিণত হয়। যা থেকে এখন একটি ব্যধিতে রূপান্তর হয়েছে। একটি সমীক্ষায় প্রকাশিত হয়েছে ১০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ অনলাইনে পর্ণ দেখাটা তাদের যে কোন নেশাকে হার মানিয়েছে। পর্ণগ্রাফি থেকে হস্তমৈথুন এবং হস্তমৈথুনের কারণে চোখের সমস্যা, স্মরণশক্তি কমে যাওয়া, মাথা ঘোরা, মাথা ব্যাথা, শারীরিক দুর্বলতা হয়ে থাকে।
.
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, পর্ণোগ্রাফি একজন পর্ণদর্শকের মাথার গঠনই পরিবর্তন করে ফেলে। এর ফলে এত বৃহৎ সংখ্যক মানুষের মতিষ্ক ধীরে ধীরে নোংরা এবং নষ্ট হয়ে যায়। তারা আরোও বলেন, যখন একজন মানুষ পর্ণোগ্রাফি দেখে তখন তার রক্তের চাপ বাড়তে থাকে শুরু করে। সেসময় তার হৃদস্পন্দন কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে যদি তিনি দুর্বল হৃদয়ের মানুষ হন তাহলে তার হার্ট আ্যাট্যাকের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়ে বেড়ে যায়। যদি আমরা ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ বিষযটি পর্যালোচনা করি তাহলে দেখতে পাবো পর্ণোগ্রাফি কতবড় একটি ব্যাভিচার। এটি আস্তে আস্তে মানুষকে যিনার দিকে নিয়ে যায় আর আপনি হয়ত জানেন যিনার শাস্তি কিরূপ! মহান রাব্বুল আলামিন বলেন, যিনার কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল এবং বিপদগামীতা (সূরা: আল-ইসরা)।
.
পর্ণগ্রাফি থেকে পরিত্রাণ পেতে আপনি নিমোক্ত বিষয়গুলো ফলো করতে পারেন। ১) পর্ণোগ্রাফি থেকে নিজেকে মুক্ত করার সবচেয়ে ভালো এবং উপযুক্ত উপায় হলো ধর্মীয় কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখুন, নামাজ পড়ুন এবং সৃষ্টিকর্তাকে ভয় করুন। ২) রাসূল (সা.) বলেছেন, হে যুবক তোমার যদি বিয়ে করার সামর্থ্য থাকে তবে তুমি বিয়ে করো। বিয়ে তোমাদের চুক্ষকে নিমজ্জিত রাখবে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করবে। ৩) আপনার মাঝে যদি এ অভ্যাসটি দীর্ঘদিন বা থেকে থাকে তাহলে একাকি ঘরের কোণে বসে থাকার মোটেও চেষ্টা করবেন না বরং বন্ধুদের সাথে এবং পরিবারের সাথে আড্ডা দিন অথবা খেলাধুলা করতে পারেন। ৪) একটি প্রবাদ আছে “অলস মতিষ্ক শয়তানের কারখানা”।
.
ছোট বড় যেকোন কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। তাহলে পর্ণোগ্রাফির কথা আপনার স্মরণেও ঢু মারবে না। ৫) অনেক সময় ফেইসবুক বা ইন্টার্নেট স্ক্রল স্ক্রল করতে করতে শয়তান আপনাকে ধোকায় ফেলবে অস্বাভাবিক নয়। এসময় আপনি ইসলামিক সঙ্গীত শুনতে পারেন বা বাহিরের খোলা হাওয়ায় যেতে পারেন। হে যুবসমাজ এখনো সময় রয়েছে অন্ধকার এ জগত থেকে পৃথিবীর সুন্দর আলোর পথে ফিরে আসার। সময় রয়েছে নিজেকে, নিজেকে সন্তানকে, নিজের বন্ধুবান্ধব কে সত্য এবং আলোর পথে ফিরানোর অন্যথায় অনেক দেরি করে ফেলবেন আর পরে আপসোস করবেন হায় আমি যদি এটা না করতাম। কেননা, পর্ণোগ্রাফি দেখার এই অভ্যাসের ফলে ব্যাভিচারের মত বড় পাপ ঘটায়, ধর্ষকের মত বড় পাপ ঘটায়।
.
পর্ণোগ্রাফির আসক্তিতে আজকের যুবসামজ কে একটি সুন্দর ও বাস্তব উদাহরণ দিই, মার্কিন সিরিয়াল রেপিস্ট ‘ট্রেন্ড বান্ডি ধর্ষণের দায়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর হওয়ার ঠিক পূর্ব মূহুর্তে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, মানসিকভাবে তাকে দুর্ধর্ষ রেপিস্ট হওয়ার পিছনে মূল ভূমিকা বা ইন্ধন যুগিয়েছিল “পর্ণোগ্রাফি” !একটি হাদিস দিয়ে শেষ করতে চাই, রাসূল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আমাকে তার দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী জিনিস (জিহ্ববা) এবং দুই পায়ের মধ্যবর্তী জিনিস (যৌনাঙ্গের) নিশ্চয়তা (সঠিক ব্যবহার) দিবে, আমি তাকে বেহেস্তের নিশ্চয়তা দিব। ( বুখারী ও মুসলিম) ।
.
সর্বোপরি, অভিভাবকবৃন্দের দৃষ্টি আর্কষণ করে বলতে চাই আপনার সন্তানের প্রতি সুনজর দিন, বয়ঃসন্ধিকালে আপনার সন্তান বন্ধুবান্ধব / অনলাইন যুগের মাধ্যমে এ নেশায় আসক্ত হতে পারে। আর এ নেশা ভয়ানক নেশা। যখন আপনার সন্তান এ বিষাক্ত নেশায় নিমজ্জিত হতে থাকবে তখন কষ্টসহিষ্ণু আর বিষণ্ণতা আপনার সন্তানের সুস্থা, স্বাভাবিক ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার পরিবেশ বৈরি হয়ে উঠবে। সুতারাং এখনই সময় বদলানোর ।
.
কেননা, এটি শয়তানের এমন একটি চোরা ফাঁদ যা দিন দিন আমাদের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত করছে। আসুন, এই ব্যাধি থেকে বেরিয়ে পৃথিবীর প্রশান্তির সুনির্মল সুবাসে আমাদের যাপিত জীবনকে রাঙিয়ে তুলি।
.
লেখকঃ শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, ২য় বর্ষ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
.

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে