কামরুল হাসান হীরা:
ইহাই চিরন্তন সত্য যে, শ্রেণী শিক্ষার মেধাবীরা প্রকৃত মেধাবী নয়  বরং প্রকৃত মেধাবী তারাই, যারা নিজ নিজ কর্মদক্ষতায় সমাজ এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে  এই মেধাবীদের চাহিদা পৃথিবীব্যাপী ।
অন্যদিকে, বর্তমানে দেশে যে হারে বেকার সমস্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে করে অদূর ভবিষ্যৎ অন্ধকার  অর্থ বা অর্থের যোগান বা অর্থের বিনিময়ে বেকার সমস্যা নির্মূল করা অসম্ভব ।
এই সম্ভাবনার দ্বার খুলতে হলে, আমাদেরকে নিজ নিজ দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা থেকে সমাজ এবং রাষ্ট্র বিনির্মাণে এক হয়ে কাজ করতে হবে তা সম্ভব হলেই, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের বেকার সমস্যা সমূলে উৎপাটন যাবে ।সমাজে বসবাসরত অবস্থায় প্রতিনিয়তই বহুমুখী সমস্যার সম্মুখীন হই এবং তা সমাধানের উপায় খুঁজে বেড়াই  ইতিহাসের পরম্পরায় সমাজ ব্যবস্থার উন্নতি ও অবনতি বরাবরই দৃশ্যমান।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বুঝা যায়, কালের বিবর্তনে বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা মৃত প্রায় । আবার এটাও লক্ষণীয় যে, পশ্চিমা সংস্কৃতির সাথে তাল মিলাতে গিয়ে আমাদের নিজস্ব কৃষ্টি-কালচার আজ বিলীন হওয়ার পথে ।প্রকৃতপক্ষে, ভিনদেশি সমাজব্যবস্থা অনুসরন করে কোনভাবেই সামাজিক পরিবর্তন করা সম্ভব না।বরং, তা করতে গিয়ে আমরা আমাদের নিজস্ব সামাজিক অবস্থান এবং নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের জায়গা থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছি।  এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে, বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা সংস্কার করা অতীব জরুরী ।কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের কবিতার অংশ “কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে; দুঃখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহিতে?” এই পংক্তিমালার মর্মবাণী চিরন্তন সত্য  কেননা জীবনে কষ্ট ছাড়া কখনোই সুখী হওয়া যায় না ।
এবার আসি আসল কথায়, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং বাস্তব জ্ঞান না থাকার কারণে যুগের পর যুগ সমাজে অতি দরিদ্ররা নানা রকমের বৈষম্যের শিকার । গবেষণায় উঠে এসেছে যে, এই সমস্যার পিছনে তারা নিজেরাই দায়ী। যেখানে নারী এবং পুরুষ উভয়ই অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত  যা একটি সামাজিক সমস্যা, এই সমস্যা সমাধানে নারী এবং পুরুষের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । এই ক্ষেত্রে সামাজিক উদ্যোক্তাদের মহৎ উদ্যোগ বা উদ্ভাবনী ধারণা সামাজিক সমস্যা সমাধানের একটি উপায়, যা নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে  যা কিনা বেকার সমস্যা প্রতিহত করার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম  সেই লক্ষ্য অর্জনে আরো বেশি সামাজিক উদ্যোক্তা তৈরি করার কাজ হাতে নিতে হবে ।
যথোপযুক্ত এবং প্রয়োজনীয় ইচ্ছাশক্তির অভাব উদ্যোক্তা হওয়ার প্রধান অন্তরায় । একজন উদ্যোক্তা হতে হলে কি পরিমাণ পুঁজি বা অর্থের প্রয়োজন লাগবে তার উপর গুরুত্ব না দিয়ে বরং ইচ্ছাশক্তিকে পুঁজি বা অর্থ ভাবাটাই উত্তম। এযাবতকালে, পৃথিবীতে যত বড় বড় উদ্যোক্তা সফল হয়েছেন, তাদের শুরুটাই হয়েছে সামাজিক উদ্যোক্তা রূপ। আমি, আপনি, আমরা সকলেই সামাজিক জীব।  আমরাই সমাজের ভালো মন্দ নিয়ে চিন্তা করি ।পাশাপাশি সমাজের মঙ্গলের জন্য যে কোন উদ্যোগ নিতে পারি । আমাদের পারস্পারিক উদ্ভাবনী শক্তিই হলো সামাজিক উদ্যোক্তা হওয়ার প্রধান সিঁড়ি বা ধাপ । একটি সমাজকে সুন্দর ভাবে পরিচালনা করার জন্য সামাজিক সম্পর্ক ও বন্ধন সুদৃঢ় করতে হয়।  পাশাপাশি তার লক্ষ্য পূরণে সামাজিক উদ্যোক্তার উপস্থিত থাকা আবশ্যকীয় । সামাজিক উদ্যোক্তা হতে গেলে আর্থিক, কায়িক এবং মানবিক দিক থেকে অনেক দক্ষতা ও ইচ্ছাশক্তি থাকা প্রয়োজন  ।যেকোনো সামাজিক সমস্যা নির্মূলে সবাইকে একসাথে কাজ করতে হয় ।
যদি একজন সামাজিক উদ্যোক্তাকে নারীর সাজসজ্জার মেকআপ বক্সের সাথে তুলনা করা হয় ।সেক্ষেত্রে বলা যায় মেকআপ বক্সের নানান রং যেমন ভাবে নারীকে রাঙিয়ে তোলে, ঠিক তেমনি, সামাজিক উদ্যোক্তাদের কর্মকাণ্ড সমাজকে নানান ভাবে রাঙাতে সাহায্য করে । সামাজিক উদ্যোক্তা কাকে বলে? বা কি? তার কোন নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই, তবে এই ক্ষেত্রে সামাজিক উদ্যোক্তাকে নানান ভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায় ।সামগ্রিকভাবে বলা যায, সামাজিক উদ্যোক্তা হচ্ছেন এমন একজন ব্যক্তি, যে কিনা তার নিজস্ব কর্মকাণ্ড কিংবা নানারূপ উদ্যোগের মাধ্যমে সমাজের যেকোন স্থায়ী সমস্যা সমাধানের জন্য যথেষ্ট সম্ভাবনা রাখেন । একজন উদ্যোক্তা সামাজিক সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক উন্নয়ন বা পরিবর্তন আনার জন্য যেকোনো ঝুঁকি বা প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে পারেন ।
সমাজে সামাজিক উদ্যোক্তার অভাব হয় না।  অভাব হয় আগ্রহ, অনুপ্রেরণা এবং মনস্তাত্ত্বিক সাহসের, যা একজন উদ্যোক্তা হওয়ার প্রধান বাধা । বর্তমান সমাজব্যবস্থায় কতক ব্যক্তিবর্গ আছেন যারা সাময়িক লাভ বা মুনাফার জন্য দীর্ঘমেয়াদি লাভ বা মুনাফা অর্জন থেকে নিজেদেরকে বঞ্চিত করে রাখেন ।তাই সামাজিক উদ্যোক্তা হতে গেল সামাজিক উন্নয়নের কথা ভেবে ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে । এই ধারা অব্যাহত রাখতে পারলে একসময় দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগ সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে, সেই মুহূর্তে প্রকৃত লাভ এবং মুনাফা দুটোই একসাথে ধরা দিবে । তাই সামাজিক উদ্যোক্তাকে সমাজের সকল স্তরের জনগণের কথা মাথায় রেখে যেকোনো জনহিতকর কর্মকান্ডের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করাটাই হবে প্রধান লক্ষ্য। সামাজিক উদ্যোক্তাদের এমন কিছু উদ্যোগ নিতে হবে যা সমাজের সর্বস্তরে সেবা পেতে সহজতর হয়।
কি কি করলে সামাজিক উদ্যোক্তা হওয়া যায়:
উন্নত প্রশিক্ষণ নিয়ে মোবাইলভিত্তিক অ্যাপস তৈরি করা এবং তা যথাযথ প্রচার ও প্রচারণা করা;
মাদকবিরোধী গণসচেতনতা;মাদক নিরাময় কেন্দ্র;সহজলভ্য হাট বাজার তৈরি; সহজলভ্য খাদ্য সামগ্রী সরবরাহ করা;স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের দোকান তৈরি; সাপ্তাহিক ও মাসিক ভিত্তিক স্বল্পমূল্যের পণ্য বিক্রির উদ্যোগ; সাপ্তাহিক ও মাসিক ভিত্তিক খাদ্য মেলা, লোকশিল্প মেলা, হস্তশিল্প মেলা ইত্যাদি আয়োজন করা; কৃষিক্ষেত্রে উন্নত জাতের বীজ সংগ্রহ এবং সরবরাহ করা; সহজলভ্য পশু, পাখির খামার তৈরি; মাছ চাষ; ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্প; নার্সারি প্রকল্প; ঔষধি গাছ সরবরাহ; বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, মোবাইল ফোন সার্ভিস, ইত্যাদি ছাড়াও আরও অনেক নতুন নতুন উদ্যোগ নিতে পারলেই অস্থায়ী ভাবে সামাজিক উদ্যোক্তা হওয়া সম্ভব । একজন সফল উদ্যোক্তাই পারেন একটি পরিবার, গ্রাম কিংবা সমাজকে বদলে দিতে । একজন উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠিত হতে পারলেই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শত শত নতুন সামাজিক উদ্যোক্তার জন্ম নিবে সামাজিক উদ্যোক্তা হতে গেলে যে বিষয়গুলো অবশ্যই মাথায় রাখা প্রয়োজন I প্রথমত, শিক্ষা, পারিবার, বংশ পরিচয়, সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থান থেকে কোন প্রকার বৈষম্য করা যাবে না ।
উপরের বিষয়গুলো উপর গুরুত্ব দিয়ে নিজেকে সামাজিক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত করাটাই হবে উত্তম পদক্ষেপ। যেমন, পারিবারিক কিংবা সমবায়ের গঠনের মাধ্যমে সামাজিক উদ্যোক্তা হওয়া সম্ভব এই ক্ষেত্রে সকলকে নিম্নরূপ বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে:
• নিয়মানুবর্তিতা; • নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি সম্মান; • সমবায়ের প্রত্যেক সদস্যের মধ্যে পারস্পারিক সুসম্পর্ক ও বিশ্বাস স্থাপন; • অর্থ সংগ্রহ, তহবিল তৈরি এবং সঠিকভাবে দায়িত্ব ভাগাভাগি করা; • সামাজিক কর্মকান্ডে নারী-পুরুষ, দল-মত নির্বিশেষে দায়িত্বের সাথে কাজ করা; • সামাজিক সমস্যা দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করা; • দীর্ঘমেয়াদী সফলতাকে প্রাধান্য দেওয়া; • প্রত্যেক সপ্তাহে বা প্রতি মাসে যৌথ সভার আয়োজন করা; • সার্বিক বিবেচনায় একজন দক্ষ উপদেষ্টা নিয়োগ দেওয়া; • সঠিক সময়ে উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা; • সামাজিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে তরুণ সমাজকে প্রশিক্ষণ ও সেবা প্রদান করা;
একজন সামাজিক উদ্যোক্তা কে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে হবে যে, এই পথ মসৃণ নয়, যেখানে অনেক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হবে । সাহস ও ঝুঁকি নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে বা এগিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে সামাজিক উদ্যোক্তাদের পরিপূর্ণতা পায় । দিনশেষে তারাই প্রকৃত পক্ষে সফল উদ্যোক্তার রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়। আর এভাবেই হাজার হাজার উদ্যোক্তার জন্ম হয় I যার ফলে, তরুণ সমাজ তাদেরকে অনুসরণ বা অনুকরণ করে একটি গ্রাম কিংবা সমাজ পরিবর্তনে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা যায় ।
ইহাই প্রতীয়মান হয় যে, সামাজিক উদ্যোক্তাদের রয়েছে অভিনব ও উদ্ভাবনশীল কৌশল বা ধারণা ।যার দ্বারা যেকোনো সামাজিক সমস্যা সমাধানে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।  আমি, আপনি কিংবা আমরা জগদ্বিখ্যাত বিল গেটস, স্টিভ জবস, কিংবা জ্যাক মা হতে চাই না । আমরা হতে চাই আমাদের সমাজের করিম, রহিম কিংবা জব্বার নামের সামাজিক উদ্যোক্তা ।আমরা সফল হলেই ইতিহাস আমাদের মনে রাখবে।  তাই আসুন আমরা একসাথে মিলে আমাদের গ্রাম কিংবা আমাদের সমাজকে বদলে দেই।  একদিন আমাদের গ্রাম হবে আমাদের শহর এবং এটাই আমাদের প্রত্যয় ।
লেখক: পি.এইচ.ডি. গবেষক ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে