dav

 
মোঃ জাহিদুল ইসলাম,কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি :
আমরা নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলি। সমতার কথা বলি, অধিকারের কথা বলি। সমনে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলি। কিন্তু নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও মানসিক উন্নতি ছাড়া এসব অসম্ভব। স্ত্রীকে অল্পসংখ্যক স্বামীই উপার্জন করার স্বাধীনতা দিয়ে থাকেন। তবে যারা দেন, সেসব স্বামীর অধিকাংশই স্ত্রীর উপার্জনের বিষয়টিকে ভাল চোখে দেখেন না।
যে সমাজে নারীদের ‘মেয়ে মানুষ’ বলে পিছে ফেলে রাখা হয়েছে, যেখানে নারীদের মধ্যেও ‘আমি মেয়ে মানুষ এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবে না’ কথাটা মনে প্রাণে গেঁথে গেছে। যেখানে অনেক সচেতন নারীর মধ্যেও পুরুষতান্ত্রিকতা কাজ করে। সে সমাজেই চোখে পড়লো একটি ভিন্ন চিত্র।
জেসমিন। স্বাধীন সবজি ব্যবসায়ী। কুমিল্লা শহরের টমছমব্রিজ সংলগ্ন কাঁচা বাজারে তিন বছর ধরে সবজি বিক্রি করছেন। তার সবজির দোকানে টমেটো, লাউ, লাল শাক, শসা ছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন শাকসবজি। চোখে পড়লো তার দোকানে ক্রেতার ভিড়।জেসমিন ছালাম মিয়ার স্ত্রী। তিন মেয়ে এক ছেলের জননী। কুমিল্লা জেলার লাঙ্গলকোট উপজেলা থেকে কুমিল্লা শহরে একটি টিন সেট রুম ভাড়া নিয়ে কোনো রকমে বাস করছেন। ছেলেকে লাঙ্গলকোট উপজেলার স্থানীয় একটি স্কুলে পড়াচ্ছেন। ছেলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে। প্রতি মাসে ছেলের পড়াশোনা বাবদ টাকা পাঠাচ্ছেন। তবে, ছেলেকে আজো জানননি তার এ ব্যবসার কথা।
জেসমিনের স্বামী তিন বছর আগে সাত তলা নির্মানাধীন ভবন থেকে পড়ে বুকে এবং মাথায় আঘাত পান। সে সময় থেকেই তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন।মাঝে মাঝে স্মৃতি হারিয়ে ফেলেন । তখন থেকেই জেসমিন সংসারের হাল ধরেন। আয়ের উৎস হিসেবে স্বাধীন ব্যবসা বেঁছে নেন।
ক্রেতা সামলানোর এক ফাঁকে জেসমিন বলেন, ‘প্রথম দিকে আমার এ কাজকে কেউ ভাল চোখে দেখেনি। অনেকে অনেক রকম কথা বলতো। আমি সেসব শুনতাম। কিন্তু কোনো জবাব দিতাম না। না শোনার ভান করে থাকতাম।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমি এসএসসি পাশ করেছি। আরবীও ভাল জানি। আমি টিউশনি খুঁজেছি। কিন্তু কেউ দেয়নি। যখন সবজি বিক্রি করা শুরু করলাম তখন তারাই নানান রকম কথা বলতে শুরু করলো। কিন্তু এ কাজকে কখনো আমি ছোট মনে করিনি। তবে এখন কেউ কিছু বলে না বরং অনেকে সম্মানের চোখে দেখে।’
কথা হয় জেসমিনের স্বামী সালামের সাথে। তিনি বলেন, ‘ আমার দুর্ঘটনার পরে নির্মাণ কোম্পানির কেউ দেখা করেনি। অনেক চেষ্টা করেও তাদের সাথে দেখা করতে পারিনি। এক টাকাও ক্ষতিপূরণ দেয়নি তারা। কত কষ্টে দিন কেটেছে। তখন তো কোনো সাংবাদিক আসেনি!
স্ত্রীর ব্যবসা করা নিয়ে প্রশ্ন করলে, তিনি জানান, ‘সে তো আর খারাপ কিছু করে উপার্জন করছে না৷ আর সে যদি এ ব্যবসা না করে আমাকে ছেড়ে চলে যেত তাহলে আমার পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব হতো না।’
কথার ফাঁকে জেসমিন জানালেন স্বামীর প্রতি তার শ্রদ্ধা ও ভালবাসার কথা। ‘আমি স্বামী ভক্ত। মাঝে মাঝে সে উল্টাপাল্টা কাজ করে, আমাকে চিনতে পারে না। এটা আমার কাছে ভাল লাগে এবং আমি এটা উপভোগ করি।’
জেসমিন বারাবার একটি কথায় জোর দিচ্ছিলেন, ‘স্বামী বা পরিবারের অন্যান্যদের মন জয় করেও বাইরে কাজ করা যায়। আমি কাজ চাই। আমি সকল ধরনের কাজ করতে ইচ্ছুক। কোনো কাজকে আমার কাছে ছোট মনে হয় না।’
তিনি বাংলাদেশের সকল নারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘তাদেরকে কাজ করতে হবে। তা যেকোনো ধরনের কাজ হতে পারে। স্বামীর সাথে সাথে স্ত্রীকেও উপার্জন করতে হবে তাহলেই সংসারে সুখ আসবে। আমি চাই দেশের সকল নারীই স্বনির্ভর হোক।’
শতবছর আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার, কেন নাহি দেবে অধিকার? বেগম রোকেয়াও নারীকে তাঁর অধস্তন অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু শত বছর পরেও এ দেশের নারীরা পিছিয়ে আছে। নারীদের তাদের অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে দরকার অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং জেসমিনের মতো মুক্ত চিন্তা।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে