সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ, অবসান হলো লি যুগের

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : ০৭:৫৩:৪২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ মে ২০২৪
  • / ২৩ Time View

লি সিয়েন লুং-এর নেতৃত্বেই সিঙ্গাপুরের অর্থনীতি সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় হয়ে ওঠে। এটি বিশ্বব্যাপী একটি প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র ও জনপ্রিয় ভ্রমণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

আর দীর্ঘ ২০ বছর ক্ষমতায় থাকার পর দ্বীপ রাষ্ট্র সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লুং পদত্যাগ করেছেন। নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ৫১ বছর বয়সী লরেন্স ওং বুধবার (১৫ মে) দায়িত্ব নিয়েছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে উপ-প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী লরেন্স ওং এর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়।

বিবিসি জানায়, ১৯৬৫ সালে সিঙ্গাপুর স্বাধীন হওয়ার পর থেকে মাত্র চারজন প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে। চারজনই ছিলেন পিপলস অ্যাকশন পার্টির (পিএপি) প্রতিনিধি। সিঙ্গাপুরের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন লি সিয়েন এর বাবা লি কুয়ান ইউ, যিনি ২৫ বছর ধরে দেশের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাকে আধুনিক সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, লি পরিবারের ছায়া থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে সিঙ্গাপুরের রাজনৈতিক নেতৃত্ব নতুনভাবে বিকশিত হবে। যদিও লি সিয়েন লুং এখনও ঊর্ধ্বতন মন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিসভায় থাকবেন।

লি এ সপ্তাহের শেষে স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার শেষ সাক্ষাৎকারে সিঙ্গাপু্রের জনগণকে তাদের সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

লি এও বলেন যে, তিনি কাজ করার চেষ্টা করেছেন তার নিজের মতো করে, যা তার বাবা এবং পূর্বসূরি গোহ চোক তং এর থেকে আলাদা।

নতুন প্রধানমন্ত্রী ৫১ বছর বয়সী লরেন্স ওং। ছবি: সংগৃহীত

তার বাবা প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থাতেই ১৯৮৪ সালে লি রাজনীতিতে যুক্ত হন। দেশটির দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী গোহ চোক তং-এর ক্ষমতকালে তিনি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করার পর ২০০৪ সালে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন।

রাজনীতিতে তার প্রথম বছরগুলোতে তিনি বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছিলেন। সমালোচকরা তার পরিবারের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও একটি রাজনৈতিক রাজবংশ গঠনের অভিযোগ এনেছিলেন যা তিনি বারবার অস্বীকার করে এসেছেন। কিন্তু দুই দশক ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তিনি তার কাজ দিয়ে দেশ ও জনগণের উন্নয়ন ঘটিয়েছেন।

তার নেতৃত্বেই সিঙ্গাপুরের অর্থনীতি সমৃদ্ধ এবং বৈচিত্র্যময় হয়ে ওঠে। এটি বিশ্বব্যাপী একটি প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র ও জনপ্রিয় ভ্রমণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। গত দুই দশকে জনপ্রতি জিডিপি দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। মন্দা, বিশ্বব্যাপী আর্থিক সংকট এবং কোভিড-১৯ মহামারি সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে সিঙ্গাপুরকে সফলভাবে পরিচালনা করার জন্য তিনি এবং তার প্রশাসনের যথেষ্ট অবদান ছিল।

ভূ-রাজনীতিতেও যথেষ্ট সফলতা দেখিয়েছেন লি সিয়েন লুং। আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার মধ্যেই তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।

তিনি সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিবিদদের নিয়ে করা জরিপের শীর্ষে অবস্থান করার পাশাপাশি নির্বাচনের সময় তার নির্বাচনী এলাকায় ধারাবাহিকভাবে সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছিলেন।

কিন্তু তার বিপুল পরিমাণ জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও তার প্রশাসনের অভিবাসন নীতি নিয়ে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়। সিঙ্গাপুরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে ক্রমবর্ধমান সামাজিক বৈষম্য ও আয়ের অসমতা বেড়ে যাওয়ায় তিনি ও তার প্রশাসন সমালোচনার শিকার হয়েছেন। তারই নেতৃত্বে ২০১১ ও ২০২০ সালে পিপলস অ্যাকশন পার্টি দেশটির ইতিহাসের সর্বনিম্ন ভোট পেয়েছিল।

লি এখন ক্ষমতা হস্তান্তর করেছেন লরেন্স ওং এর কাছে। ওং সিঙ্গাপুরের ঐতিহ্যবাহী লি পরিবারের বাইরে থেকে ক্ষমতায় এসেছেন। বুধবার দায়িত্ব নেওয়ার পর ওং সম্পূর্ণ নতুন নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা পূর্ববর্তী প্রজন্মের থেকে আলাদা হবে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ, অবসান হলো লি যুগের

Update Time : ০৭:৫৩:৪২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ মে ২০২৪

লি সিয়েন লুং-এর নেতৃত্বেই সিঙ্গাপুরের অর্থনীতি সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় হয়ে ওঠে। এটি বিশ্বব্যাপী একটি প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র ও জনপ্রিয় ভ্রমণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

আর দীর্ঘ ২০ বছর ক্ষমতায় থাকার পর দ্বীপ রাষ্ট্র সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লুং পদত্যাগ করেছেন। নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ৫১ বছর বয়সী লরেন্স ওং বুধবার (১৫ মে) দায়িত্ব নিয়েছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে উপ-প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী লরেন্স ওং এর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়।

বিবিসি জানায়, ১৯৬৫ সালে সিঙ্গাপুর স্বাধীন হওয়ার পর থেকে মাত্র চারজন প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে। চারজনই ছিলেন পিপলস অ্যাকশন পার্টির (পিএপি) প্রতিনিধি। সিঙ্গাপুরের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন লি সিয়েন এর বাবা লি কুয়ান ইউ, যিনি ২৫ বছর ধরে দেশের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাকে আধুনিক সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, লি পরিবারের ছায়া থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে সিঙ্গাপুরের রাজনৈতিক নেতৃত্ব নতুনভাবে বিকশিত হবে। যদিও লি সিয়েন লুং এখনও ঊর্ধ্বতন মন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিসভায় থাকবেন।

লি এ সপ্তাহের শেষে স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার শেষ সাক্ষাৎকারে সিঙ্গাপু্রের জনগণকে তাদের সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

লি এও বলেন যে, তিনি কাজ করার চেষ্টা করেছেন তার নিজের মতো করে, যা তার বাবা এবং পূর্বসূরি গোহ চোক তং এর থেকে আলাদা।

নতুন প্রধানমন্ত্রী ৫১ বছর বয়সী লরেন্স ওং। ছবি: সংগৃহীত

তার বাবা প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থাতেই ১৯৮৪ সালে লি রাজনীতিতে যুক্ত হন। দেশটির দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী গোহ চোক তং-এর ক্ষমতকালে তিনি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করার পর ২০০৪ সালে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন।

রাজনীতিতে তার প্রথম বছরগুলোতে তিনি বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছিলেন। সমালোচকরা তার পরিবারের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও একটি রাজনৈতিক রাজবংশ গঠনের অভিযোগ এনেছিলেন যা তিনি বারবার অস্বীকার করে এসেছেন। কিন্তু দুই দশক ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তিনি তার কাজ দিয়ে দেশ ও জনগণের উন্নয়ন ঘটিয়েছেন।

তার নেতৃত্বেই সিঙ্গাপুরের অর্থনীতি সমৃদ্ধ এবং বৈচিত্র্যময় হয়ে ওঠে। এটি বিশ্বব্যাপী একটি প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র ও জনপ্রিয় ভ্রমণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। গত দুই দশকে জনপ্রতি জিডিপি দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। মন্দা, বিশ্বব্যাপী আর্থিক সংকট এবং কোভিড-১৯ মহামারি সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে সিঙ্গাপুরকে সফলভাবে পরিচালনা করার জন্য তিনি এবং তার প্রশাসনের যথেষ্ট অবদান ছিল।

ভূ-রাজনীতিতেও যথেষ্ট সফলতা দেখিয়েছেন লি সিয়েন লুং। আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার মধ্যেই তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।

তিনি সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিবিদদের নিয়ে করা জরিপের শীর্ষে অবস্থান করার পাশাপাশি নির্বাচনের সময় তার নির্বাচনী এলাকায় ধারাবাহিকভাবে সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছিলেন।

কিন্তু তার বিপুল পরিমাণ জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও তার প্রশাসনের অভিবাসন নীতি নিয়ে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়। সিঙ্গাপুরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে ক্রমবর্ধমান সামাজিক বৈষম্য ও আয়ের অসমতা বেড়ে যাওয়ায় তিনি ও তার প্রশাসন সমালোচনার শিকার হয়েছেন। তারই নেতৃত্বে ২০১১ ও ২০২০ সালে পিপলস অ্যাকশন পার্টি দেশটির ইতিহাসের সর্বনিম্ন ভোট পেয়েছিল।

লি এখন ক্ষমতা হস্তান্তর করেছেন লরেন্স ওং এর কাছে। ওং সিঙ্গাপুরের ঐতিহ্যবাহী লি পরিবারের বাইরে থেকে ক্ষমতায় এসেছেন। বুধবার দায়িত্ব নেওয়ার পর ওং সম্পূর্ণ নতুন নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা পূর্ববর্তী প্রজন্মের থেকে আলাদা হবে।