সদরঘাটে নৌদুর্ঘটনা এড়াতে ২০ দফা সুপারিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : ১১:৩৩:৫৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২০
  • / ১৪০ Time View
নিজস্ব প্রতিবেদক:

নির্ধারিত সময়েই প্রকাশিত হলো সম্প্রতি সদরঘাটে লঞ্চডুবির ঘটনায় গঠিত তদন্ত প্রতিবেদন। মঙ্গলবার দুপুরে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এই প্রতিবেদন তুলে ধরলেও এই ঘটনার জন্য দায়ী কে বা কী কারণে এমন ট্রাজেডি ঘটলো তা নিয়ে কিছু জানাননি তিনি।

প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, তদন্ত প্রতিবেদনে সদরঘাট টার্মিনালের আশেপাশে খেয়াঘাট না রাখাসহ ২০ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। নৌআইনে শাস্তির মেয়াদ ও জরিমানার পরিমাণ যুগোপযোগী করে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।

২৯ জুন সকালে রাজধানীর শ্যামবাজার সংলগ্ন বুড়িগঙ্গা নদীতে চাঁদপুর রুটে চলা ময়ূর-২ লঞ্চের ধাক্কায় মুন্সীগঞ্জ থেকে আসা ‘মর্নিং বার্ড’ লঞ্চ ডুবে যায়। এতে ৩৪ জন প্রাণ হারায়।

প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, ভিডিও ফুটেজ অনুযায়ী নৌদুর্ঘটনাটি এখনো হত্যাকাণ্ড বলেই মনে হয়। তবে, ঘাতক লঞ্চটির ফিটনেসে ঘাটতি নেই। পুলিশি তদন্তে এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড প্রমাণিত হলে ৩০২ ধারায় দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

গত ২৯ জুন সকালে ওই লঞ্চডুবির ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। কমিটিকে পরবর্তী সাত কর্মদিবসের মধ্যে দুর্ঘটনার কারণ উদঘাটন, দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তি/সংস্থাকে শনাক্তকরণ এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় উল্লেখ করে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ দিতে বলা হয়।

তদন্ত কমিটির সূত্রে জানা গেছে, লঞ্চডুবির ঘটনায় প্রকাশিত ভিডিও থেকে স্পষ্ট হয়েছে ময়ূর-২ নামের লঞ্চটি সকল নিয়ম-কানুন উপেক্ষা করে মর্নিং বার্ডকে ধাক্কা দিয়ে ডুবিয়ে দেয়।

সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত কমিটির সুপারিশের বিস্তারিত তুলে ধরে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী জানান, তদন্ত কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছে সদরঘাটের ভাটিতে ৭/৮ কিলোমিটার ও উজানে ৩/৪ কিলোমিটার বার্দি উঠিয়ে দিতে হবে। এ অংশে পল্টুন ছাড়া নৌযান নোঙ্গর করা যাবে না।

পর্যায়ক্রমে সেখান থেকে শিপইয়ার্ড ও ডকইয়ার্ড উঠিয়ে দিতে হবে। যান ঘাট ছাড়ার পূর্বে ভয়েজ ডিক্লেরেশন দিতে হবে। এছাড়া সদরঘাটে পল্টুনের সংখ্যা বৃদ্ধি, ফিটনেসবিহীন লঞ্চ বন্ধ, নৌযানের গতি নির্ধারণ করে কন্ট্রোল টাওয়ার স্থাপন করার সুপারিশ করা হয় প্রতিবেদনে।

নৌ দুর্ঘটনা গবেষণার বিষয়ে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠিন প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারেও বলেও তদন্ত কমিটির সুপারিশে বলা হয়।

প্রতিমন্ত্রী জানান, ‘প্রতিবেদনে ২০টি সুপারিশ করা হয়েছে। সুপারিশগুলো যাচাই বাছাই করে দেখা হচ্ছে। যেগুলো সম্ভব দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে। যেগুলো বাস্তবায়ন সময়সাপেক্ষ সেগুলো সময় নিয়েই বাস্তবায়ন করা হবে। প্রয়োজনে এ নিয়ে সরকারের উচ্চ মহলের পরামর্শও গ্রহণ করা হবে।’

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, মামলার তদন্তের স্বার্থে দুর্ঘটনার কারণ জানানো যাচ্ছে না। তিনি বলেন, প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে বিচার কাজ শুরু হবে। মূল তদন্ত যেটা হচ্ছে আইনি প্রক্রিয়ার জন্য সেই তদন্তটা যেন কোনোভাবে বিঘ্নিত না হয় সেজন্য এটা জনসমক্ষে প্রকাশ করছি না। আমরা একটা শৃঙ্খলার মধ্যে আনার চেষ্টা করছি।

২০ দফা সুপারিশ

ভবিষ্যতে নৌ দুর্ঘটনা এড়াতে তদন্ত কমিটি যে ২০ দফা সুপারিশ করেছে, সংবাদ সম্মেলনে সেগুলো পড়ে শোনান নৌ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মেসবাহ উদ্দিন। সেগুলো হলো:

১. সদরঘাট থেকে ভাটিতে সাত থেকে আট কিলোমিটার এবং উজানে তিন থেকে চার কিলোমিটার অংশে বার্থিং উঠিয়ে দিতে হবে। ওই অংশে পন্টুন ছাড়া কোথাও নৌযান নোঙ্গর করে রাখা যাবে না। নদীর ওই অংশ থেকে পর্যায়ক্রমে শিপইয়ার্ড ও ডকইয়ার্ড উঠিয়ে দিতে হবে।

২. সদরঘাট টার্মিনালের আশপাশে কোনো খেয়াঘাট রাখা যাবে না। ওয়াইজঘাটের উজানে খেয়াঘাট স্থানান্তর করা যেতে পারে।

৩. লঞ্চের সামনে, পেছনে, মাস্টার ব্রিজে, ইঞ্জিন রুমে, ডেকে সিসিটিভি ক্যামেরা বসাতে হবে। মাস্টারের দেখার সুবিধার জন্য ব্যাক ক্যামেরার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া লঞ্চে পর্যায়ক্রমে ওয়াকি-টকি ব্যবহার চালু করতে হবে।

৪. লঞ্চ বা জাহাজ ঘাট ত্যাগ করার আগেই ভয়েজ ডিক্লারেশন দাখিল বাধ্যতামূলক করতে হবে। লঞ্চে কতজন যাত্রী বহন করা হচ্ছে, ডেক সাইডে এবং ইঞ্জিনে কারা কারা কর্মরত, তা ভয়েজ ডিক্লারেশনে উল্লেখ করতে হবে।

৫. ফিটনেসবিহীন লঞ্চ চলাচল বন্ধ করতে হবে। প্রত্যেক লঞ্চে জীবন রক্ষাকারী লাইফ জ্যাকেট ও লাইফ বয় রাখতে হবে।

৬. সকল নদীপথে বিভিন্ন নৌযানের গতি সীমা নির্ধারণ করে দিতে হবে। ঢাকা সদরঘাটে নৌযানের গতি নিয়ন্ত্রণের জন্য টাওয়ার স্থাপন ও সিসি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে।

৭. লঞ্চে মেকানিকাল স্টিয়ারিংয়ের পরিবর্তে ইলেট্রো হাইড্রলিক স্টিয়ারিং প্রবর্তন করার উদ্যোগ নিতে হবে।

৮. যাত্রীবাহী লঞ্চে মেইন ইঞ্জিনে লোকাল কন্ট্রোল সিস্টেমের পরিবর্তে ব্রিজ কন্ট্রোল সিস্টেম চালুর ব্যবস্থা নিতে হবে পর্যায়ক্রমে।

৯. ‘সাংকেন ডেক’ লঞ্চ পর্যায়ক্রমে উঠিয়ে দিতে হবে। প্রশস্ত ও ব্যস্ত নদীতে এ ধরনের নৌযান চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রশস্ত ও ব্যস্ত নদীতে যথাযথ সনদধারী মাস্টার ও ড্রাইভার ছাড়া নৌযান পরিচালনা করা যাবে না। ডিসপেনসেশন সনদের প্রথা বাতিল করতে হবে।

১০. যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ করে শিশু, নারী, বয়স্ক যাত্রীদের ওঠা-নামার সুবিধার্থে গ্যাংওয়ে বা ব্রিজ স্থাপন করতে হবে নৌযানে।

১১. সদরঘাটে পন্টুনের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে।

১২. সার্ভের সময় নৌযানের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও অন্যান্য বিষয় দেখার জন্য পরিদর্শন কার্যক্রম আরও জোরদার এবং নির্বাহী ম্যাজিস্টেট ও মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম বৃদ্ধি করতে হবে।

১৩. লঞ্চে ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত টিকেট বিক্রি বন্ধ করতে হবে। টিকেট দেখানো ছাড়া কোনো যাত্রীকে লঞ্চে উঠতে দেওয়া যাবে না। অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের সুযোগ বন্ধ করার জন্য কেবিন সংখ্যা ও ডেকের যাত্রীর সংখ্যা নির্ধারণ করে দিয়ে ও সকল টিকেট অনলাইনে বিক্রির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

১৪. নৌ আইন অমান্যকারীদের শাস্তির মেয়াদ ও জরিমানার পরিমাণ সুযোপযোগী করে আইন সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

১৫. নৌ কর্মীদের প্রশিক্ষণ ফলপ্রসূ করার জন্য বিআইডব্লিউটিএ কে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। নৌযানের ফিটনেস ও নৌকর্মীদের যোগ্যতা সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে নৌপরিবহন অধিদপ্তরকে আরও কঠোর ভূমিকা নিতে হবে। সার্ভে সনদ প্রদানকারী সংস্থা নৌপরিবহন অধিদপ্তরে সার্ভেয়ারের সংখ্যা এবং সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে।

১৬. ডেক অ্যান্ড ইঞ্জিন পারসোনেল ট্রেইনিং সেন্টারের সংখ্যা বাড়াতে হবে। দেশে বর্তমানে প্রায় ১৪ হাজার নিবন্ধিত জাহাজ ছাড়াও অনিবন্ধিত অসংখ্য জাহাজ রয়েছে। এসব জাহাজে গড়ে কমপক্ষে ২ জন মাস্টার ও ২ জন ইঞ্জিন চালক নিয়োগ করতে হলে প্রায় ৫৬ হাজার প্রশিক্ষিত জনবল দরকার। শিক্ষিত বেকার তরুণ-তরুণীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে জাহাজে নিয়োগ করতে পারলে দুর্ঘটনা কিছুটা কমতে পারে। এ ধরনের ট্রেইনিং সেন্টারের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি উপস্থিতি দৃশ্যমান করতে হবে।

১৭. নৌ দু্র্ঘটনার কারণ উদঘাটনের জন্য দায়ী মাস্টার, ইঞ্জিন ড্রাইভারদের সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তারের ব্যবস্থা নিতে হবে। নৌ দুর্ঘটনা ও নৌযান সংক্রান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরোধ ও আসামি গ্রেপ্তারের জন্য সদরঘাটে নৌপুলিশের জনবল সংখ্যা ৯ জন থেকে বাড়িয়ে কমপক্ষে ২৫ জন করতে হবে।

১৮. নৌযান ও নৌকর্মীদের চলাচল ও অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার জন্য নৌযান ও নৌকর্মীদের ডেটাবেজ তৈরি এবং ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করার উদ্যোগ নিতে হবে।

১৯. নৌ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আনুনিকায়ন করতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরকে যথাযথ কারিগরি সুবিধা দিতে হবে। সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

২০. নৌ দুর্ঘটনা নিয়ে গবেষণার বিষয়ে একটি প্রতিষ্ঠান করা যেতে পারে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

সদরঘাটে নৌদুর্ঘটনা এড়াতে ২০ দফা সুপারিশ

Update Time : ১১:৩৩:৫৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২০
নিজস্ব প্রতিবেদক:

নির্ধারিত সময়েই প্রকাশিত হলো সম্প্রতি সদরঘাটে লঞ্চডুবির ঘটনায় গঠিত তদন্ত প্রতিবেদন। মঙ্গলবার দুপুরে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এই প্রতিবেদন তুলে ধরলেও এই ঘটনার জন্য দায়ী কে বা কী কারণে এমন ট্রাজেডি ঘটলো তা নিয়ে কিছু জানাননি তিনি।

প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, তদন্ত প্রতিবেদনে সদরঘাট টার্মিনালের আশেপাশে খেয়াঘাট না রাখাসহ ২০ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। নৌআইনে শাস্তির মেয়াদ ও জরিমানার পরিমাণ যুগোপযোগী করে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।

২৯ জুন সকালে রাজধানীর শ্যামবাজার সংলগ্ন বুড়িগঙ্গা নদীতে চাঁদপুর রুটে চলা ময়ূর-২ লঞ্চের ধাক্কায় মুন্সীগঞ্জ থেকে আসা ‘মর্নিং বার্ড’ লঞ্চ ডুবে যায়। এতে ৩৪ জন প্রাণ হারায়।

প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, ভিডিও ফুটেজ অনুযায়ী নৌদুর্ঘটনাটি এখনো হত্যাকাণ্ড বলেই মনে হয়। তবে, ঘাতক লঞ্চটির ফিটনেসে ঘাটতি নেই। পুলিশি তদন্তে এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড প্রমাণিত হলে ৩০২ ধারায় দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

গত ২৯ জুন সকালে ওই লঞ্চডুবির ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। কমিটিকে পরবর্তী সাত কর্মদিবসের মধ্যে দুর্ঘটনার কারণ উদঘাটন, দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তি/সংস্থাকে শনাক্তকরণ এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় উল্লেখ করে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ দিতে বলা হয়।

তদন্ত কমিটির সূত্রে জানা গেছে, লঞ্চডুবির ঘটনায় প্রকাশিত ভিডিও থেকে স্পষ্ট হয়েছে ময়ূর-২ নামের লঞ্চটি সকল নিয়ম-কানুন উপেক্ষা করে মর্নিং বার্ডকে ধাক্কা দিয়ে ডুবিয়ে দেয়।

সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত কমিটির সুপারিশের বিস্তারিত তুলে ধরে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী জানান, তদন্ত কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছে সদরঘাটের ভাটিতে ৭/৮ কিলোমিটার ও উজানে ৩/৪ কিলোমিটার বার্দি উঠিয়ে দিতে হবে। এ অংশে পল্টুন ছাড়া নৌযান নোঙ্গর করা যাবে না।

পর্যায়ক্রমে সেখান থেকে শিপইয়ার্ড ও ডকইয়ার্ড উঠিয়ে দিতে হবে। যান ঘাট ছাড়ার পূর্বে ভয়েজ ডিক্লেরেশন দিতে হবে। এছাড়া সদরঘাটে পল্টুনের সংখ্যা বৃদ্ধি, ফিটনেসবিহীন লঞ্চ বন্ধ, নৌযানের গতি নির্ধারণ করে কন্ট্রোল টাওয়ার স্থাপন করার সুপারিশ করা হয় প্রতিবেদনে।

নৌ দুর্ঘটনা গবেষণার বিষয়ে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠিন প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারেও বলেও তদন্ত কমিটির সুপারিশে বলা হয়।

প্রতিমন্ত্রী জানান, ‘প্রতিবেদনে ২০টি সুপারিশ করা হয়েছে। সুপারিশগুলো যাচাই বাছাই করে দেখা হচ্ছে। যেগুলো সম্ভব দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে। যেগুলো বাস্তবায়ন সময়সাপেক্ষ সেগুলো সময় নিয়েই বাস্তবায়ন করা হবে। প্রয়োজনে এ নিয়ে সরকারের উচ্চ মহলের পরামর্শও গ্রহণ করা হবে।’

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, মামলার তদন্তের স্বার্থে দুর্ঘটনার কারণ জানানো যাচ্ছে না। তিনি বলেন, প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে বিচার কাজ শুরু হবে। মূল তদন্ত যেটা হচ্ছে আইনি প্রক্রিয়ার জন্য সেই তদন্তটা যেন কোনোভাবে বিঘ্নিত না হয় সেজন্য এটা জনসমক্ষে প্রকাশ করছি না। আমরা একটা শৃঙ্খলার মধ্যে আনার চেষ্টা করছি।

২০ দফা সুপারিশ

ভবিষ্যতে নৌ দুর্ঘটনা এড়াতে তদন্ত কমিটি যে ২০ দফা সুপারিশ করেছে, সংবাদ সম্মেলনে সেগুলো পড়ে শোনান নৌ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মেসবাহ উদ্দিন। সেগুলো হলো:

১. সদরঘাট থেকে ভাটিতে সাত থেকে আট কিলোমিটার এবং উজানে তিন থেকে চার কিলোমিটার অংশে বার্থিং উঠিয়ে দিতে হবে। ওই অংশে পন্টুন ছাড়া কোথাও নৌযান নোঙ্গর করে রাখা যাবে না। নদীর ওই অংশ থেকে পর্যায়ক্রমে শিপইয়ার্ড ও ডকইয়ার্ড উঠিয়ে দিতে হবে।

২. সদরঘাট টার্মিনালের আশপাশে কোনো খেয়াঘাট রাখা যাবে না। ওয়াইজঘাটের উজানে খেয়াঘাট স্থানান্তর করা যেতে পারে।

৩. লঞ্চের সামনে, পেছনে, মাস্টার ব্রিজে, ইঞ্জিন রুমে, ডেকে সিসিটিভি ক্যামেরা বসাতে হবে। মাস্টারের দেখার সুবিধার জন্য ব্যাক ক্যামেরার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া লঞ্চে পর্যায়ক্রমে ওয়াকি-টকি ব্যবহার চালু করতে হবে।

৪. লঞ্চ বা জাহাজ ঘাট ত্যাগ করার আগেই ভয়েজ ডিক্লারেশন দাখিল বাধ্যতামূলক করতে হবে। লঞ্চে কতজন যাত্রী বহন করা হচ্ছে, ডেক সাইডে এবং ইঞ্জিনে কারা কারা কর্মরত, তা ভয়েজ ডিক্লারেশনে উল্লেখ করতে হবে।

৫. ফিটনেসবিহীন লঞ্চ চলাচল বন্ধ করতে হবে। প্রত্যেক লঞ্চে জীবন রক্ষাকারী লাইফ জ্যাকেট ও লাইফ বয় রাখতে হবে।

৬. সকল নদীপথে বিভিন্ন নৌযানের গতি সীমা নির্ধারণ করে দিতে হবে। ঢাকা সদরঘাটে নৌযানের গতি নিয়ন্ত্রণের জন্য টাওয়ার স্থাপন ও সিসি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে।

৭. লঞ্চে মেকানিকাল স্টিয়ারিংয়ের পরিবর্তে ইলেট্রো হাইড্রলিক স্টিয়ারিং প্রবর্তন করার উদ্যোগ নিতে হবে।

৮. যাত্রীবাহী লঞ্চে মেইন ইঞ্জিনে লোকাল কন্ট্রোল সিস্টেমের পরিবর্তে ব্রিজ কন্ট্রোল সিস্টেম চালুর ব্যবস্থা নিতে হবে পর্যায়ক্রমে।

৯. ‘সাংকেন ডেক’ লঞ্চ পর্যায়ক্রমে উঠিয়ে দিতে হবে। প্রশস্ত ও ব্যস্ত নদীতে এ ধরনের নৌযান চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রশস্ত ও ব্যস্ত নদীতে যথাযথ সনদধারী মাস্টার ও ড্রাইভার ছাড়া নৌযান পরিচালনা করা যাবে না। ডিসপেনসেশন সনদের প্রথা বাতিল করতে হবে।

১০. যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ করে শিশু, নারী, বয়স্ক যাত্রীদের ওঠা-নামার সুবিধার্থে গ্যাংওয়ে বা ব্রিজ স্থাপন করতে হবে নৌযানে।

১১. সদরঘাটে পন্টুনের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে।

১২. সার্ভের সময় নৌযানের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও অন্যান্য বিষয় দেখার জন্য পরিদর্শন কার্যক্রম আরও জোরদার এবং নির্বাহী ম্যাজিস্টেট ও মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম বৃদ্ধি করতে হবে।

১৩. লঞ্চে ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত টিকেট বিক্রি বন্ধ করতে হবে। টিকেট দেখানো ছাড়া কোনো যাত্রীকে লঞ্চে উঠতে দেওয়া যাবে না। অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের সুযোগ বন্ধ করার জন্য কেবিন সংখ্যা ও ডেকের যাত্রীর সংখ্যা নির্ধারণ করে দিয়ে ও সকল টিকেট অনলাইনে বিক্রির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

১৪. নৌ আইন অমান্যকারীদের শাস্তির মেয়াদ ও জরিমানার পরিমাণ সুযোপযোগী করে আইন সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

১৫. নৌ কর্মীদের প্রশিক্ষণ ফলপ্রসূ করার জন্য বিআইডব্লিউটিএ কে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। নৌযানের ফিটনেস ও নৌকর্মীদের যোগ্যতা সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে নৌপরিবহন অধিদপ্তরকে আরও কঠোর ভূমিকা নিতে হবে। সার্ভে সনদ প্রদানকারী সংস্থা নৌপরিবহন অধিদপ্তরে সার্ভেয়ারের সংখ্যা এবং সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে।

১৬. ডেক অ্যান্ড ইঞ্জিন পারসোনেল ট্রেইনিং সেন্টারের সংখ্যা বাড়াতে হবে। দেশে বর্তমানে প্রায় ১৪ হাজার নিবন্ধিত জাহাজ ছাড়াও অনিবন্ধিত অসংখ্য জাহাজ রয়েছে। এসব জাহাজে গড়ে কমপক্ষে ২ জন মাস্টার ও ২ জন ইঞ্জিন চালক নিয়োগ করতে হলে প্রায় ৫৬ হাজার প্রশিক্ষিত জনবল দরকার। শিক্ষিত বেকার তরুণ-তরুণীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে জাহাজে নিয়োগ করতে পারলে দুর্ঘটনা কিছুটা কমতে পারে। এ ধরনের ট্রেইনিং সেন্টারের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি উপস্থিতি দৃশ্যমান করতে হবে।

১৭. নৌ দু্র্ঘটনার কারণ উদঘাটনের জন্য দায়ী মাস্টার, ইঞ্জিন ড্রাইভারদের সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তারের ব্যবস্থা নিতে হবে। নৌ দুর্ঘটনা ও নৌযান সংক্রান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরোধ ও আসামি গ্রেপ্তারের জন্য সদরঘাটে নৌপুলিশের জনবল সংখ্যা ৯ জন থেকে বাড়িয়ে কমপক্ষে ২৫ জন করতে হবে।

১৮. নৌযান ও নৌকর্মীদের চলাচল ও অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার জন্য নৌযান ও নৌকর্মীদের ডেটাবেজ তৈরি এবং ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করার উদ্যোগ নিতে হবে।

১৯. নৌ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আনুনিকায়ন করতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরকে যথাযথ কারিগরি সুবিধা দিতে হবে। সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

২০. নৌ দুর্ঘটনা নিয়ে গবেষণার বিষয়ে একটি প্রতিষ্ঠান করা যেতে পারে।