রাজধানীর অভিজাত এলাকা ধানমন্ডির ১০টি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে ১০ জন ভাষাসৈনিকের নামে। প্রায় দেড় যুগ আগে সড়কগুলোর নামকরণ করা হলেও প্রচার-প্রচারণার অভাবে তা আড়ালেই থেকে গেছে। কোনো বাসাবাড়ি বা অফিসের ঠিকানায় সড়কগুলোর নাম ব্যবহার করা হয় না। এমনকি সরকারি প্রতিষ্ঠানের দেয়া বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল, পানির বিলেও সড়কের প্রকৃত নাম লেখা হচ্ছে না। তবে প্রতিটি সড়কের শুরুতে নামফলক বসিয়ে রাখা হয়েছে। শুধু এই নামফলকেই যেন বন্দি ভাষাসৈনিকদের নামে সড়কগুলো।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীলরা বলছেন, ভাষাসৈনিকের নামে যে সড়কগুলো রয়েছে, বাসাবাড়ি এবং অফিসের ঠিকানায় ওইসব সড়কের প্রকৃত নাম ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

ভাষাসৈনিকদের নামের সড়কগুলো সম্প্রতি সরেজমিনে ঘুরে দুই শতাধিক মানুষের সঙ্গে কথা হয় জাগো নিউজের। এর মধ্যে মাত্র একটি সড়কের নাম একজন চিনতে পারেন। বাকিদের কেউই চিনতে পারেননি।

‘ভাষাসৈনিক কাজী গোলাম মাহবুব সড়ক’ ধানমন্ডি ৯ নম্বর রোড, ‘ভাষাসৈনিক গাজীউল হক সড়ক’ ধানমন্ডি ৮ নম্বর রোড, ‘ভাষাসৈনিক আব্দুল মতিন সড়ক’ ধানমন্ডি ৭ নম্বর রোড, ‘ভাষাসৈনিক আবদুর রশীদ তর্কবাগিশ সড়ক’ ধানমন্ডি ৬ নম্বর রোড, ‘ভাষাসৈনিক আবুল কালাম সামসুদ্দিন সড়ক’ ধানমন্ডি ৫ নম্বর রোড, ‘ভাষাসৈনিক অলি আহাদ সড়ক’ ধানমন্ডি ৪ নম্বর রোড, ‘ভাষাসৈনিক মোহাম্মদ সুলতান সড়ক’ ধানমন্ডি ৩ নম্বর সড়ক, ‘ভাষাসৈনিক ডা. গোলাম মাওলা সড়ক’ ধানমন্ডি ১ নম্বর রোড, ‘ভাষাসৈনিক বিচারপতি আবদুর রহমান চৌধুরী সড়ক’ ধানমন্ডি ১৫ নম্বর রোড এবং ‘ভাষাসৈনিক তোয়াহা সড়ক’ ধানমন্ডি ৯-এ রোড হিসেবে পরিচিত সবার কাছে।

‘ভাষাসৈনিক ডা. গোলাম মাওলা সড়কে’ পাঁচ বছর ধরে রিকশা চালানো মো. শরিফ বলেন, ‘পাঁচ বছরের মধ্যে এই প্রথম ভাষাসৈনিক ডা. গোলাম মাওলা সড়কের নাম শুনলাম। এর আগে কেউ কখনো এই নাম বলেননি। এই সড়ক কোথায় আমি বলতে পারবো না। আমি এই ১ নম্বর রোডের যেখানে যাবেন নিয়ে যেতে পারবো।’

সড়কটির একটি ভবনে ১২ বছর ধরে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন আব্দুর রশিদ। তিনি বলেন, ‘আপনার কাছ থেকেই প্রথম জানলাম এই সড়কের নাম ‘ভাষাসৈনিক ডা. গোলাম মাওলা সড়ক’। কিন্তু এ নাম তো কোথাও ব্যবহার হয় না। বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল, পানির বিল সবকিছুতেই ধানমন্ডি-১ নম্বর রোড লেখা থাকে। যদি বাসাবাড়ি এবং বিভিন্ন বিলের কগজে ‘ভাষাসৈনিক ডা. গোলাম মাওলা সড়ক’ ব্যবহার কর হয় খুব সহজেই সবাই জানতে পারবে।’

‘ভাষাসৈনিক আবদুর রশীদ তর্কবাগিশ সড়কের’ একটি বাসায় পাঁচ বছর ধরে আছেন বেসরকারি চাকরিজীবী সবুর শেখ। তিনি বলেন, ‘এই সড়কের নাম একজন ভাষাসৈনিকের নামে, এটা আগে জানা ছিল না। এটা ভেবে সত্যিই লজ্জা পাচ্ছি। সড়কটির প্রকৃত নাম যেন সবাই জানে সেজন্য সংশ্লিষ্টদের উচিত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার পাশাপাশি প্রচার-প্রচারণা চালানো।’

‘ভাষাসৈনিক অলি আহাদ সড়কের’ বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ভাষাসৈনিকের নামে রাস্তার নামকরণ করা হলেও তা তো কোথাও ব্যবহার হয় না। তাহলে আমরা জানবো কীভাবে? যদি এই নাম বিভিন্ন ঠিকানায় ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক করা হতো, তাহলে আজ দেখতেন সবাই সড়কের প্রকৃত নাম জানতো। তখন কেউ আর ধানমন্ডি ৩, ৪ বা ৮, ৯ নম্বর রোড বলে চিনতো না। কিন্তু সবক্ষেত্রে রোড নম্বর ব্যবহার করায় সড়কের প্রকৃত নাম কেউ জানে না।’

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘সিটি করপোরেশন থেকে সব ধরনের ট্রেড লাইসেন্স নতুন নামে (ভাষাসৈনিকদের নামে নামকরণ করা সড়ক) ইস্যু করা হচ্ছে। সব বাড়িঘরে এ নাম ব্যবহারের নির্দেশনা দেয়া আছে। আমরা হোল্ডিং ট্যাক্স সংগ্রহ করি এই নামে। সিটি করপোরেশন থেকে চেষ্টা করা হচ্ছে নতুন নাম পরিচিত করার। আমরা আশা করছি ধীরে ধীরে এটা জনগণের কাছে পরিচিতি পাবে।’

ধানমন্ডিতে ভাষাসৈনিকদের নামে থাকা সড়কগুলো পড়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে। এই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রফিকুল ইসলাম বাবলা বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, ভাষাসৈনিকদের স্মৃতি স্মরণীয় করে রাখতে এসব সড়কের দাফতরিক নামগুলো ব্যবহার করা দরকার। এতে তরুণ প্রজন্ম বাংলা ভাষার মর্যাদা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারবে। আমি এ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখব। সড়কগুলোর ফলক আরও দৃশ্যমান করবো। স্থানীয় পর্যায়ে সভা-সেমিনারে নামগুলো প্রচার করবো।’

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

thirteen + 8 =