Homeমতামতবঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন

এএইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন:

রাজনৈতিক নেতা ও তাঁর নেতৃত্বের ভার। এমন দিকটি নিয়ে চিন্তা করা যাক। মানব সমাজে একজন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর বিচরণ। হ্যাঁ, এমন রাজনৈতিক চরিত্র সারা পৃথিবীর বাস্তবতায় হাতে গোনা কয়েকজন হবেন। অর্থাৎ, হাজার বছরে এমন কেউ হয়তো আসেন এই গ্রহে। মানুষের প্রতি তাঁর ভালবাসা ছিল অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্বরূপ । অতঃপর, জনশ্রেণির ওপর অধিকার অর্জন করার সবিশেষ যোগ্যতা। তাঁকে আলাদা করে চেনায়। ঠিক এরপর, অভিভাবক হয়ে নির্দেশনা দেয়ার ক্ষমতা, তাঁকে মহান করে প্রদর্শন করায়। ইতিহাস ঠিক এভাবেই সংকলিত। একটি জাতির স্বাধীনতা চেয়ে বন্দীদশা থেকে মুক্ত হওয়া এবং বিজয় সাধিত হওয়ার পরেও অপেক্ষা। কা’র জন্য? ওই সেই হিমালয়সম মানুষটির জন্য। তিনি এলেন, আবারো বুঝিয়ে দিলেন, তাঁর বজ্রকণ্ঠ জমা রাখাই আছে। মানুষ দেশের সব প্রান্ত থেকে ছুটে আসছে। চিড়া, গুড়, মুড়ি হাতে নিয়ে প্রিয় নেতাকে একবার দেখবে বলে! মানুষ আর মানুষ ! রাস্তায় ঢল ! স্বাধীন বাংলাদেশ জানান দিল, আজ ১০ জানুয়ারি, বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে আমরা আমাদের আবেগের সকল আনন্দাশ্রু তাঁর জন্য জমা করে রেখেছি। তাঁকে ধরতে চাই, দেখতে চাই আর ভালবাসতে চাই।

১০ জানুয়ারি , ১৯৭২ সাল। বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় দিন। এই দিনে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পূর্ণতা পেয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক ভাষণে কার্যত বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে রেখেছিলেন। আর ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধু সর্বস্তরের জনগণকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান। স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পরেই পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে নিয়ে আটক রাখা হয়।

বঙ্গবন্ধুকে জেলখানায় রেখেই চলে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞ। ২৫ মার্চের কালোরাত্রিতে পাকিস্তানি বর্বর হানাদার বাহিনী বাঙালি জাতির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে শুরু করে গণহত্যা। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাঙালি জাতি শুরু করে প্রতিরোধ যুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাস সশস্ত্র সংগ্রামের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আসে কাঙ্ক্ষিত বিজয়। তবে তার জন্য দিতে হয় বড় মূল্য। ৩০ লক্ষ মানুষকে শাহাদাৎ বরণ করতে হয়। লুণ্ঠিত হয় লাখো মা-বোনের ইজ্জত।

বঙ্গবন্ধু আজীবন বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখে গেছেন। নেতৃত্ব দিয়েছেন স্বাধীনতা ও স্বাধিকার আন্দোলনে। বাঙালির জাতিকে একটি স্বাধীন মানচিত্র এনে দেয়ার ইস্পাত-কঠিন সংকল্পে বঙ্গবন্ধু পরিণত হয়েছিলেন পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের চক্ষুশূলে। যে কারণে জীবনের একটা বড় সময় শেখ মুজিবকে বার বার জেল, জুলুম ও অত্যাচার-নির্যাতন ভোগ করতে হয়। ১৮ বছরের মত হবে, তিনি বন্দিত্বে ছিলেন। পাকিস্তান ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে গড়ে উঠা বাঙালির সব আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়েই শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে ওঠেন জাতির অবিসংবাদিত নেতা এবং ভূষিত হন ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে।

স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন বন্দী বঙ্গবন্ধুর উপর চালানো হয় অকথ্য নির্যাতন। করা হয় হত্যা পরিকল্পনা। এমনকি তৈরি করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর জন্য ফাঁসির মঞ্চ। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ততদিনে পরিণত হয়েছেন স্বাধীনতার মূর্ত প্রতীকে। পাকিস্তানী হানাদাররা জেনে গিয়েছিল, বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসিতে ঝোলানোর মানে হবে নিজেদের কবর খোঁড়া। প্রতিশোধের নেশায় বাঙালি জাতির মুক্তির সংগ্রাম হবে আরও বেগবান। তাছাড়া ততদিনে বঙ্গবন্ধু আর বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক সমর্থন।

বঙ্গবন্ধুকে জেলখানায় রেখে হত্যায় ব্যর্থ পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করে ১৬ ডিসেম্বর। বাংলাদেশ নামের নতুন রাষ্ট্র স্থান পায় বিশ্ব-মানচিত্রে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তখনো পাকিস্তানের জেলখানায় বন্দী। মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর বিশ্বব্যাপী বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা আরও বাড়তে থাকে। বাঙালির পাশাপাশি বিশ্বের স্বাধীনতা ও শান্তিকামি মানুষও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠে। আন্তর্জাতিক চাপের কাছে নতিস্বীকার করে অবশেষে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তান। কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু সোজা লন্ডন চলে যান। সেখান থেকে ভারত হয়ে ১০ জানুয়ারি স্বদেশে ফেরেন।

১০ জানুয়ারি, ১৯৭২ সাল। বাঙালি জাতির স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে সদ্য-স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা পরিণত হয়েছিল জনতার মহানগরে। বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী বিমানটি যখন তৎকালীন তেজগাঁও বিমানবন্দরের রানওয়ে স্পর্শ করে, তখন লাখো জনতা মুহুর্মুহু হর্ষধ্বনি ও গগনবিদারী ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে স্বাগত জানায় প্রাণপ্রিয় নেতাকে। জনস্রোত বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিমানবন্দর থেকে সরাসরি পৌঁছায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তখনকার রেসকোর্স ময়দান)। তাৎক্ষণিক জনসভায় বঙ্গবন্ধু দেশের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা আর ভালবাসা ব্যক্ত করেন । উদ্বুদ্ধ করেন সদ্য-স্বাধীন দেশকে নতুন করে গড়ে তুলতে। যাকে বঙ্গবন্ধু দ্বিতীয় বিপ্লব’ নাম দেন।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সোনার বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। শুরু করেছিলেন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে নতুন করে ঢেলে সাজাবার কাজ। যদিও সেই কাজ তিনি সম্পূর্ণ করে যেতে পারেননি। রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের মাত্র তিন বছর সাত মাসের মাথায় বাংলাদেশ বিরোধী আন্তর্জাতিক-দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীরা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে কাপুরুষোচিতভাবে হত্যা করার মাধ্যমে থামিয়ে দেয় বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার কার্যক্রম। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মানব ইতিহাসের জঘন্যতম সেই হত্যাযজ্ঞের পর বাংলাদেশ যেন পরিণত হয় স্বাধীনতাবিরোধীদের আখড়ায়। দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে রাজাকারদের দাপট। দেশ চলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের উল্টোপথে। যা দেখে বুক ভেঙে গেছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষের। এতসবের মধ্যে একজন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা লড়াই করে গেছেন বাঙালি জাতি আর বাংলাদেশকে শেকড়ের সন্ধান দিতে।

১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বে শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার নবযাত্রা। যা গত ১৪ বছরে পেয়েছে নতুন মাত্রা। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ এখন অনেকটাই বাস্তব। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু থেকে শুরু করে মেট্রোরেল আমাদের আছে। উন্নয়নশীল দেশের নাগরিক হিসেবে দেশের মানুষ এখন উন্নত জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। বেড়েছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। বাংলাদেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট এখন চক্কর দিচ্ছে মহাকাশে। এসবই তো বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন। যে স্বপ্ন তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে প্রথম পা রেখে দেখিয়েছিলেন পুরো জাতিকে।

বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ এখন সমগ্র বিশ্বের কাছে উন্নয়নের ‘রোলমডেল’ । বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথেই এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ । যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন শেখ হাসিনা । তিনি ঠিকই শ্রেষ্ঠ শাসক হয়ে এবং একটি বিশেষ দলের শীর্ষ নেতা হয়ে বাংলাদেশকে অতি উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন। অনুপ্রেরণায় তথা আলোকবর্তিকা হয়ে আছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান । যিনি ভেজা চোখে বাংলার মানুষের বুকে ফিরে এসেছেন, এমন ধ্বনিত সুরে থেকে প্রিয় বাংলাদেশের মাটিতে প্রত্যাবর্তন করেন। যে তারিখটি বাংলা ও বাংলাদেশের ইতিহাসে শুধুই উপলক্ষ তাড়িত দিবস নয়, এমন আলেখ্য আনন্দের, জাগরণের ও আবেগের সকল উচ্ছ্বাসের মাহেন্দ্রক্ষণ থেকে সৃষ্ট দিবস, যা স্বাধীনতা অর্জনের অর্জনের প্রাপ্তিকেও রঙিন করে ঘোষণা করায়।

লেখক: সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

RELATED ARTICLES

Most Popular