Monday, November 29, 2021
Homeজাতীয়বঙ্গবন্ধু’র বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য অসাম্প্রদায়িকতা

বঙ্গবন্ধু’র বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য অসাম্প্রদায়িকতা

বঙ্গবন্ধু’র বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য অসাম্প্রদায়িকতা। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে জাতির পিতা সমগ্র বাঙালি জাতিকে এক করে, জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে, যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সেদিনের সেই ময়দানে জমায়েত হয়েছিলেন জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব বয়সের নারী ও পুরুষ। ৭ই মার্চের ভাষণের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে প্রাণপণে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। সেখানে কিন্তু একটিবারের জন্যও জাত-ধর্মের ভেদাভেদ কোনধরনের বিভেদের সীমারেখা টানতে পারে নি। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সকল ধর্মের মানুষ প্রতিহত করেছিলো পাকিস্তানি বর্বর বাহিনীকে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছিলেন ৩০ লাখ মানুষ আর সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন দুই লাখ মা-বোন। এই বাংলার হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ- খ্রিস্টান সবার মিলিত রক্তস্রোত গিয়ে মিশেছিলো একটি ধারায়। বাংলার আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়েছিল সকল ধর্মের মা-বোনের আর্তনাদ আর হাহাকারে।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। এরই ভিত্তিতে ১০ এপ্রিল আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। আর এই ঘোষণাপত্রই ছিল আমাদের নয় মাসব্যাপী সংগঠিত আন্দোলন-সংগ্রাম-রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক, সামাজিক ও আইনগত ভিত্তি।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুধু মাত্র স্বাধীন মানচিত্র, পতাকা বা অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য হয় নি। নয় মাসব্যাপী এই যুদ্ধ প্রকৃতপক্ষেই ছিল মুক্তিযুদ্ধ। দেশের সকল ধর্ম-বর্ণের, সকল পেশার মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন সব দিক থেকে মুক্তির জন্য। যুদ্ধজয়ী স্বাধীন একটি দেশের সংবিধান যা ১৯৭২ সালে রচিত হয়েছিল, সেই সংবিধানে মুক্তিকামী বাঙালির আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটেছিল।

হিন্দু- মুসলিম- বৌদ্ধ- খ্রিস্টান নির্বিশেষে সব বাংলা ভাষাভাষী মানুষ অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবোধকে অবলম্বন করে স্বাধীনতা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে একজোট হয়েছিলেন। অসাম্প্রদায়িক বা নিরপেক্ষতার বোধ বরাবরই বাঙালিকে নতুন মাত্রায় উজ্জীবিত করেছে। ১৯৫২ সালে চীন ভ্রমণের পর বঙ্গবন্ধু’র আস্থা জন্মেছিল সমাজতন্ত্রের উপর; তবে সমাজতন্ত্র নিয়ে তাঁর ছিল নিজস্ব স্টাইল। অর্থনৈতিক মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে তিনি সমাজতন্ত্রকে বেছে নিয়েছিলেন। আমাদের মুক্তি সংগ্রামে আদর্শিক প্রেরণা হিসেবে এসব মূল্যবোধ ও স্বপ্ন মরণপণ যুদ্ধরত বাঙালিকে উদ্দীপ্ত করেছে এবং সদ্য স্বাধীন দেশে রচিত ‘৭২ এর সংবিধানে তা মূর্ত হয়েছে।

গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন বাংলাদেশের সংবিধানের রুপরেখা ঘোষণা করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই অধিবেশনেই তিনি বলেছিলেন, “আমি চারটি স্তম্ভকে স্মরণ করতে চাই, যে চারটি স্তম্ভকে সামনে রেখে আমাদের দেশের সংবিধান তৈরি করতে হবে। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপক্ষতা। আমরা গণতন্ত্র দিতে চাই এবং গণতন্ত্র দিতেই আজ আমরা এই পরিষদে বসেছি। কারণ, আজ আমরা যে সংবিধান দেব, তাতে মানুষের অধিকারের কথা লেখা থাকবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ জনগণের জানমাল নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে। এমন সংবিধানই জনগণের সামনে পেশ করতে হবে। আজ এখানে বসে চারটি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে আমাদের ভবিষ্যত বংশধরদের জন্য এমন সংবিধান রচনা করতে হবে, যাতে তারা দুনিয়ায় সভ্য দেশের মানুষের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।”

১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদের অধিবেশনে সংবিধান গৃহীত হওয়ার প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধু অনন্য অসাধারণ এক ভাষণ দিয়েছিলেন। এই ভাষণে বঙ্গবন্ধু ‘গণতন্ত্র’, ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র নতুন সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্নজীবনী’ তে একাধিক স্থানে সমাজতন্ত্র ও সাম্প্রদায়িকতা সম্পর্কে তার অবস্থান স্পষ্ট করে বলেছেন “ আওয়ামী লীগ ও তার কর্মীরা যে কোন ধরনের সাম্প্রদায়িকতাকে ঘৃণা করে। আওয়ামী লীগের মধ্যে অনেক নেতা ও কর্মী আছে যারা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করে; এবং তারা জানে সমাজতন্ত্রের পথই একমাত্র জনগণের মুক্তির পথ। ধনতন্ত্রবাদের মাধ্যমে জনগণকে শোষণ করা চলে। যারা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করে, তারা কোনদিন কোনরকমের সাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাস করতে পারে না। তাদের কাছে মুসলমান, হিন্দু, বাঙালি, অবাঙালি সকলেই সমান। শোষক শ্রেণীকে তারা পছন্দ করে না। পশ্চিম পাকিস্তানেও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে এরকম অপপ্রচার করা হয়েছে।”

বঙ্গবন্ধু ৪ নভেম্বরের ভাষণে ধর্মনিরপক্ষতা সম্পর্কে বলেছেন, “ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্ম-কর্ম করার অধিকার থাকবে।আমরা আইন করে ধর্মকে বন্ধ করতে চাই না এবং করবো না। মুসলমান তাদের ধর্ম পালন করবে, তাদের বাধা দেয়ার ক্ষমতা এ রাষ্ট্রের কারও নাই। হিন্দুরা তাদের ধর্ম পালন করবে, কারও বাধা দেওয়ার ক্ষমতা নাই। বৌদ্ধরা তাদের ধর্ম পালন করবে, খৃস্টানরা তাদের ধর্ম পালন করবে তাদের কেউ বাধা দিতে পারবে না। আমাদের শুধু আপত্তি হলো এই যে, ধর্মকে কেউ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে পারবে না। ২৫ বৎসর আমরা দেখেছি ধর্মের নামে জুয়াচুরি, ধর্মের নামে শোষণ, ধর্মের নামে বেঈমানী, ধর্মের নামে অত্যাচার, খুন, ব্যাভিচার- এই বাংলাদেশের মাটিতে এসব চলেছে। ধর্ম অতি পবিত্র জিনিস। পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা চলবে না। যদি কেউ বলে যে, ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়েছে, আমি বলব ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়নি। সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্মীয় অধিকার রক্ষা করার ব্যবস্থা করেছি।”

‘৭২ সালের সংবিধান রচনার দায়িত্বে যাঁরা ছিলেন তাঁরা যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, তুরস্ক, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারতের সংবিধানকে পর্যালোচনা করেছিলেন। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সংবিধানকে অধ্যায়ন করে, পর্যালোচনা করেছিলেন এসব সংবিধানের সবল ও দূর্বল দিক। একটাই লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের জন্য শ্রেষ্ঠতম সংবিধান রচনা করা।

১৭ মার্চ, ১৯৭৩ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সুনামগঞ্জের এক জনসভায় বলেছিলেন-
“আল্লাহ কিন্তু রাব্বুল আলামিন। আল্লাহ কিন্তু রাব্বুল মুসলিমিন নন। সমস্ত মানুষের সে খোদা, কোন সম্প্রদায়ের খোদা তো নয়। তাই আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল যে সাম্প্রদায়িকতার বীজ যেন বাংলার মাটিতে বপন না করা হয়। তাহলে ত্রিশ লক্ষ যে শহীদ হয়েছে তাদের আত্মা শান্তি পাবে না। স্বাধীনতা পাওয়া যেমন কষ্টকর, স্বাধীনতা রক্ষা করাও তেমন কষ্টকর।”

সংবিধানের ৫ম সংশোধনী জারি করে জেনারেল জিয়া রাষ্ট্রীয় মূলনীতি থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ বাতিল করেছিলেন, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠনের উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছিলেন, সংবিধানের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ….’ এবং প্রস্তাবনাসহ একাধিক স্থানে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ সংযোজন করেছিলেন। জেনারেল জিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করে আরেক উর্দিধারী জেনারেল এরশাদ ৮ম সংশোধনীর মাধ্যম ইসলামকে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ ঘোষণা করেছিলেন। এসব সংশোধনীর সাথে প্রকৃত ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই, এরা তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য এই সংশোধনী করেছিলেন।

বাংলাদেশ যদি একটি ইসলামি রাষ্ট্রই হবে তাহলে কী দরকার ছিল একনদী রক্তস্রোত পেরিয়ে, ত্রিশ লাখ মানুষের আত্মত্যাগ আর দুই লাখ মা-বোনের আর্তনাদের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের?

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করছি আমরা। জাতি হিসেবে আমাদের অর্জন কতটুকু যে বিষয়ে বলব না। শুধু বলব ৫০ বছর বয়সী একটি দেশের গায়ে এখনও সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্প লেগে আছে। এখনও কোন কোন সময়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে ধর্মের নামে হানাহানি, রক্তপাত ঘটিয়ে যাচ্ছে মৌলবাদীও সাম্প্রদায়িক দলগুলো। বঙ্গবন্ধু’র রাজনৈতিক দর্শন ‘৭২ সালের সংবিধান কার্যকর থাকলে বাংলদেশে স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে এসেও ধর্মের নামে নির্যাতন, হানাহানি, সন্ত্রাস, বোমাবাজি, অগ্নিসংযোগ, রক্তপাত হতো না।

বঙ্গবন্ধু’র সুযোগ্য কন্যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্ব অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ এখন আর ঘূর্ণিঝড়-ক্ষুধা-দারিদ্র-মঙ্গার দেশ বলে পরিচিত নয়। বাংলাদেশের অভূতপূর্ব অগ্রগতি ও উন্নয়ন বিশ্বের অনেক দেশের জন্য এখন ‘রোল মডেল’ হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশ যদি স্বীয় মহিমায় বিশ্বের মানচিত্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চায় এবং বিশ্বদরবারে শান্তির আলোকবর্তিকা জ্বালাতে চায় তাহলে বঙ্গবন্ধু’র আদর্শ অনুসরণ করা ছাড়া বিকল্প কোন পথ নেই।

লেখকঃ ডা. মুরাদ হাসান এম.পি
প্রতিমন্ত্রী,
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়।

 

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular