বছর শেষ হলেও করোনা মহামারি শেষ হয়নি। তবে নতুন বছরে আশার আলো দেখাচ্ছে সদ্য উদ্ভাবিত কয়েকটি টিকা। ইতিমধ্যে পাঁচটি টিকার ব্যবহার শুরু হয়েছে। কয়েক মাসের মধ্যে আরও কয়েকটি টিকা অনুমোদন পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার উদ্ভাবিত টিকা বাংলাদেশে আসার সম্ভাবনা প্রবল হয়েছে। করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসবে, এমন আশা এ দেশের মানুষেরও।

গত বুধবার যুক্তরাজ্যের ওষুধ নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার অনুমোদন দিয়েছে। খুব শিগগির ভারতও এই টিকার অনুমোদন দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই টিকা কেনার জন্য বাংলাদেশ সরকার, বেক্সিমকো ফার্মা ও ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের মধ্যে চুক্তি আছে। বাংলাদেশে এই টিকা ব্যবহারের আগে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে।

সাধারণত নতুন টিকা ব্যবহারের আগে গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কয়েক বছর সময় লেগে যায়। মার্চ মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছিল, করোনার টিকার জন্য বিশ্ববাসীকে কমপক্ষে ১৮ মাস অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু এক বছরের কম সময়ে একাধিক নতুন টিকা উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছেন বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা। বিশ্বে করোনার টিকার আগে এত দ্রুততম সময়ে কোনো টিকার উদ্ভাবন হয়নি।

নিউইয়র্ক টাইমস শুরু থেকে করোনা টিকার গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপর নজর রেখে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই সংবাদপত্র বলছে, বর্তমানে ৬৪টি করোনার টিকা প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে। ১৬টি টিকার তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল চলছে। ৬টি টিকার সীমিত পর্যায়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। ৩টি টিকা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পেয়েছে।

হাতে আসা টিকা

রাশিয়া প্রথমে আনুষ্ঠানিকভাবে তার নাগরিকদের টিকা দেওয়ার কথা ঘোষণা করে। এই টিকার নাম স্পুতনিক-ভি। গত আগস্টে অনুমোদনের পর ডিসেম্বরের শুরুতে ব্যাপক ভিত্তিতে এই টিকার ব্যবহার শুরু হয়েছে। এই টিকার তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ (ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল) কম মানুষের ওপর হয়েছিল বলে রাশিয়ার বাইরের জনস্বাস্থ্যবিদদের কাছে এই টিকার গ্রহণযোগ্যতা কম হতে দেখা গেছে। রাশিয়ার বাইরে বেলারুশ ও আর্জেন্টিনায় এই টিকার ব্যবহার হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ কোম্পানি ফাইজার ও জার্মানির গবেষণা প্রতিষ্ঠান বায়োএনটেকের উদ্ভাবিত টিকা প্রথম থেকেই আলোচনায় ছিল। গত ২ ডিসেম্বর জরুরি ব্যবহারের জন্য এই টিকার প্রথম অনুমোদন দেয় যুক্তরাজ্য। এরপর ১১ ডিসেম্বর অনুমোদন দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এই দুই দেশ ও কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ টিকাটির অনুমোদন দিয়েছে এবং ব্যবহারও শুরু করেছে।

এরপর গত ১৮ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) মডার্না ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ (এনআইএস) উদ্ভাবিত টিকার অনুমোদন দেয়। মডার্নার টিকা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ একাধিক দেশে ব্যবহারের অনুমোদন পেয়েছে।

চীনে উদ্ভাবিত চারটি টিকা সীমিত আকারে চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে ব্যবহার শুরু হয়েছে। চীনের চারটি প্রতিষ্ঠান ক্যানসিনো, সিনোফার্ম, সিনোফার্ম-উহান এবং সিনোভ্যাক টিকাগুলো উদ্ভাবন করেছে। এ ছাড়া রাশিয়ার ভেক্টর ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত টিকা রাশিয়ায় সীমিত আকারে ব্যবহার শুরু হয়েছে।

এগিয়ে থাকা টিকা

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান টিকার অগ্রগতির ওপর নজর রাখছেন। তিনি বলেন, ‘বহু বিজ্ঞানী ও প্রতিষ্ঠান টিকা উদ্ভাবনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের নামকরা একাধিক টিকা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের টিকার তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা চলছে। আগামী দু-তিন মাসের মধ্যে সেসব টিকা চলে আসবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের জনসন অ্যান্ড জনসন কোম্পানি তাদের তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা শুরু করেছে গত সেপ্টেম্বরে। ৪৫ হাজার মানুষের ওপর করা পরীক্ষা জানুয়ারি মাসেই শেষ হওয়ার কথা।

যুক্তরাষ্ট্রের অন্য কোম্পানি নভোভ্যাক্স তাদের উদ্ভাবিত টিকা দক্ষিণ আফ্রিকায় দ্বিতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা শুরু করেছিল গত আগস্ট মাসে। এক মাস পরে সেপ্টেম্বরে তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা শুরু হয় যুক্তরাজ্যে। এই টিকার পরীক্ষা যুক্তরাষ্ট্রেও হচ্ছে। কোম্পানিটি ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে টিকা উৎপাদনের চুক্তি করেছে। তবে নভোভ্যাক্সের উৎপাদিত টিকা প্রথম পর্যায়ে পাবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া।

ভারতের কোম্পানি ভারত বায়োটেক, ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিকেল রিসার্চ এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি যৌথভাবে টিকা উদ্ভাবনের চেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের টিকার নাম ‘কোভ্যাক্সিন’। টিকাটির তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা শুরু হয়েছে এবং ধারণা করা হচ্ছে, ২০২১ সালের শুরুর দিকে এর ফলাফল জানা যাবে। আগামী জুন থেকে এই টিকা ব্যবহার করা যাবে বলে কোম্পানিটি আশা করে।

এতগুলো টিকার মধ্যে শুধু জনসন অ্যান্ড জনসন কোম্পানির টিকা এক ডোজ ব্যবহার করতে হবে। অন্য সব টিকা দুই ডোজ ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে।

দেশে কবে আসবে টিকা

দেশে যেকোনো নতুন ওষুধ বা টিকা ব্যবহারের অনুমোদন দেয় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। কোভিড-১৯ টিকা বিতরণ ও প্রস্তুতি কমিটির প্রধান এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা বলেন, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার অনুমোদনের জন্য বেক্সিমকোকে পদক্ষেপ নিতে হবে। টিকার অনুমোদনের প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ও কাগজপত্র ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে জমা দিতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল হাসান বলেন, ‘অনুমোদনের জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টেশনের কাজ আমরা করছি।’

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যে অনুমোদন পাওয়া ওষুধ বা টিকা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত ওষুধ বা টিকা ঔষধ প্রশাসন দপ্তরের অনুমোদন পায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখনো কোনো টিকার অনুমোদন দেয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন সংস্থা ও দাতাদের সহায়তায় গড়ে ওঠা বৈশ্বিক উদ্যোগ কোভ্যাক্সের মাধ্যমে যেসব টিকা সংগ্রহ ও বিতরণ করা হবে, সেই তালিকায় অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা আছে। এ বিষয়ে মীরজাদী সেব্রিনা বলেন, ‘এই টিকার অনুমোদন দিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিলম্ব করবে বলে মনে হয় না।’

চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশে টিকাটি অনুমোদন দেওয়ার এক মাসের মধ্যে সেরাম ইনস্টিটিউট ৫০ লাখ টিকা সরবরাহ করবে বেক্সিমকোর মাধ্যমে। এরপর প্রতি মাসে ৫০ লাখ করে টিকা দেবে। এভাবে মোট তিন কোটি টিকা কেনা হবে সেরাম থেকে।

বেক্সিমকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল হাসান বলেন, সরকার কত দ্রুত অনুমোদন দেবে, তার ওপর নির্ভর করবে টিকা বাংলাদেশে কবে আসবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

19 − 12 =