Friday, January 21, 2022
Homeমতামতগৌরবময় বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী

গৌরবময় বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী

অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ:

১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস বাংলাদেশের বিশেষ দিন হিসেবে প্রতি বছর রাষ্ট্রীয়ভাবে দেশের সর্বত্র পালন করা হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাস্ত করে বিজয় অর্জন করে বাংলাদেশ। যেসব কীর্তিমান মানুষের আত্মত্যাগে এই বিজয় অর্জন সম্ভব হয়েছিল, এই দিনে সারা দেশে তাদের ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। তাই দিনটিকে গৌরবময় বিজয় দিবস হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বিজয়ের অনুভূতি সব সময়ই আনন্দের। তবে একই সঙ্গে দিনটি বেদনারও, বিশেষ করে যারা স্বজন হারিয়েছেন তাদের জন্য। অগণিত মানুষের আত্মত্যাগে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা। আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের এবং যেসব নারী ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, তাদের।

বাঙালি জাতির ইতিহাস হাজার বছরের পরাধীনতার ইতিহাস। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের হাত থেকে ভারতীয় উপমহাদেশ স্বাধীন হলেও এই ভূখণ্ডের বাঙালির স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আসেনি। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত বিভক্ত হয় এবং পূর্ব বাংলাকে নিয়ে পাকিস্তান নামে একটি অসম রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। তখন থেকেই পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বাঙালির ওপর তাদের শাসন-শোষণ এবং নির্যাতন চালায়। অত্যাচার-অনাচার, জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে, অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য, বাংলা ভাষার জন্য ১৯৪৭ সালের পর থেকেই আন্দোলন শুরু হয়।

বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা, বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ধারাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জাতি ১৯৭১ সালে উপনীত হয়। ৭ মার্চ ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে তাঁর অমর ভাষণে জাতিকে নির্দেশনা দিয়ে স্বাধীনতার পথ সুগম করেন। লাখ লাখ মানুষের সমাবেশে দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন। তিনি ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলে, যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করা’র আহ্বান জানান। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে প্রস্তুতি নিতে থাকে বাঙালি জাতি। ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে আন্দোলনকামী বাংলার মানুষের ওপর লেলিয়ে দেওয়া পাকিস্তানি বাহিনী এক পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। এই প্রেক্ষাপটে তাৎক্ষণিকভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এর পরপরই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। তখন থেকেই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার যুদ্ধ।

দীর্ঘ ৯ মাস ধরে চলে এই যুদ্ধ। পাকহানাদার বাহিনী বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নকে ভেঙে দিতে শুরু করে চরম নির্যাতন ও গণহত্যা। নির্যাতন-গণহত্যার পাশাপাশি ধর্ষণ, শহরের পর শহর, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয় পাকবাহিনীরা। বাংলাদেশ পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অদম্য কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, যুব, নারীসহ সব শ্রেণি-পেশার সর্বস্তরের বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে।

সর্বস্তরের মানুষ মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেও এদেশের কিছু মানুষ, জাতির কিছু কুলাঙ্গার সন্তান পাকহানাদার বাহিনীর পক্ষ নেয়। রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনী গঠন করে পাকহানাদার বাহিনীর সঙ্গে গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞে মেতে ওঠে। পরাজয়ের চূড়ান্ত পরিণতি বুঝতে পেরে বিজয়ের দুই দিন আগে জাতির সূর্য সন্তান বুদ্ধিজীবীদের বেছে বেছে হত্যা করে। এ কাজেও সহযোগিতা ও সরাসরি অংশ নেয় এদেশীয় রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনী ও শান্তি কমিটির সদস্যরা।

স্বাধীনতার এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়ায় প্রতিবেশী দেশ ভারত। খাদ্য, আশ্রয়, অস্ত্র, সৈন্যসহ সার্বিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশাল ভূমিকা রাখে রাশিয়া (তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন)।

শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে মুক্তিযুদ্ধে দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে যায় বাঙালি। অবশেষে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে) হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর প্রায় ৯১ হাজার ৬৩৪ জন সদস্য বাংলাদেশ ও ভারতের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ নামক একটি নতুন স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে।

আজ বাংলাদেশের স্বাধীন জাতীয় রাষ্ট্র হিসেবে ৫০ বছর পূর্তি হলো। এই ৫০ বছরে আমাদের অর্জন খুব একটা কম নয়। তবে অর্জন হয়তো আরো বেশি হতে পারত, কিন্তু যা হয়েছে তাও গর্ব করার মতো। বাংলাদেশ এখন বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। এসব কিছুর প্রতিফলন দেখা যায় বিদ্যুতায়ন, গ্রামীণ সড়কের ঘনত্ব, শিল্পায়ন, গৃহায়ণ, নগরায়ণ, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, দারিদ্র্য-বিমোচন প্রভৃতি ক্ষেত্রে। সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও আমাদের ৫০ বছরের অগ্রগতি স্বস্তিদায়ক। যেমনÑ সার্বিক সাধারণ শিক্ষা, স্বাস্থ্য তথা শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যু, গড় আয়ু, ইপিআই, নারীর ক্ষমতায়ন, জন্ম ও মৃত্যুহার হ্রাস ইত্যাদিতে অগ্রগতির উল্লেখ করা যেতে পারে।

১৬ ডিসেম্বর বাঙালি জাতির জীবনে সর্বোচ্চ গৌরবের একটি অবিস্মরণীয় দিন। জীবন দিয়ে যুদ্ধ করে ৩০ লাখ শহীদের রক্ত এবং ২ লাখ মা-বোনের ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে এই বিজয় অর্জিত হয়। যত দিন পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ এবং বাঙালি জাতি থাকবে, তত দিন এই দিনটির গুরুত্ব ও সম্মান অক্ষুণ্ন থাকবে।

লেখক: উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular